স্টাফ রিপোর্টার, আগরতলা, ১৯ জানুয়ারি।। মাতৃভাষার পাশাপাশি অন্যান্য ভাষার চর্চা অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ হতে সহায়তা করে। প্রধানমন্ত্রীর সুযোগ্য নেতৃত্বে জাতীয় শিক্ষা নীতির সংশোধনীর ফলে মাতৃভাষায় শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ সুনিশ্চিত হয়েছে।
আজ রবীন্দ্র শতবার্ষিকী ভবনে আয়োজিত ৪৪তম ককবরক সাল-2022 শীর্ষক অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করে এই কথা বলেন মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব কুমার দেব। অনুষ্ঠানে ককবরক টিচার্স হ্যান্ডবুক, স্যুভেনির, ম্যাগাজিন সহ আরও বেশ কিছু প্রকাশনার আবরণ উন্মোচন করেন মুখ্যমন্ত্রী সহ অন্যান্য অতিথিগণ।
এবারের ককবরক সাল উদযাপনের মূল ভাবনা হলো ‘মাতৃভাষাকে সম্মান জানাই। শিক্ষা দপ্তরের অধীন ককবরক ভাষা ও অন্যান্য সংখ্যালঘু ভাষা অধিকার এবং জনজাতি কল্যাণ দপ্তরের অধীন উপজাতি গবেষণা ও সংস্কৃতির কেন্দ্রের যৌথ ব্যবস্থাপনায় এদিনের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ককবরক ভাষার প্রতি সম্মাননা স্বরূপ গন্ডাছড়ার নাম পরিবর্তন করে গন্ডাতুইসা এবং আঠারমুড়ার নাম পরিবর্তন করে হাচুক বেরেম করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজ্য সরকার।
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ভ্রমণ পিপাসুদের কাছে ডম্বুর ভ্রমণের মাধ্যমে ও সড়ক পথে রাজ্যে আগত যাত্রীদের মাধ্যমে এই দুই জায়গার নতুন নামাকরণ অনায়াসে বিশ্ব আঙ্গিনায় পৌঁছে যাবে। মাতৃভাষার পাশাপাশি নিজস্ব কৃষ্টি সংস্কৃতির পরম্পরাকে সঙ্গে নিয়ে ককবরক ভাষা সহ অন্যান্য ভাষার চর্চা দ্বারা অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধতার পথ সুগম হয়।
ককবরক ভাষা চর্চার প্রতি আরও আগ্রহী হওয়ার লক্ষ্যে সবার প্রতি আহ্বান রাখেন। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, যত বেশি ভাষা রপ্ত করা যায় তত বেশি অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের সুযোগ তৈরি হয়। প্রধানমন্ত্রীর দিশা নির্দেশনায় জাতীয় শিক্ষা নীতির সংশোধনী মাতৃভাষায় চর্চার ও শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ সুনিশ্চিত করেছে।
মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, অনুষ্ঠানে প্রথমবারের মত আত্মপ্রকাশ হওয়া টিচার্স হ্যান্ডবুক সহ অন্যান্য প্রকাশনা ককবরক ভাষার প্রসার ও শিক্ষা প্রদানে অগ্রণী ভূমিকা নেবে। রাজ্যের জনজাতিদের আর্থ সামাজিক জীবনমান বিকাশে ১৩০০ কোটি টাকার আর্থিক প্যাকেজ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নেবে। জনজাতিদের সম্মানার্থে ও সার্বিক বিকাশে সফলভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে।
খাদ্য, পরিশ্রুত পানীয় জল, উন্নত সড়ক সংযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ সহ শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান সার্বিক উন্নয়নের অন্যতম শর্তগুলি সুনিশ্চিত হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, চেষ্টার দ্বারাই সাফল্যের পথ সুনিশ্চিত হয়। তাই ককবরক ভাষা আয়ত্ব করার ক্ষেত্রেও সবার প্রচেষ্টা থাকা প্রয়োজন। ভারতীয় সংস্কৃতি ও পরম্পরা আমাদের ঐতিহ্য।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে শিক্ষামন্ত্রী রতনলাল নাথ বলেন, মাতৃভাষা মাতৃদুগ্ধ সম ত্রিপুরায় দেববর্মা, ত্রিপুরা, রিয়াৎ, জমাতিয়া, নোয়াতিয়া, কলই সহ বিভিন্ন জাতি গোষ্ঠীর প্রায় আট লক্ষ মানুষ ককবরক ভাষায় কথা বলেন।
বাঙ্গালীদের মধ্যেও অনেকেই ককবরক ভাষায় অভ্যস্ত। মনের ভাব প্রকাশের ভাষা যদি দুর্বল হয়ে যায় তা অত্যন্ত দুঃখজনক। সেদিকে লক্ষ্য রেখে বিভিন্ন ভাষা চর্চার প্রসারে গুরুত্ব আরোপ করেছে রাজ্য সরকার।
রাজ্যে অনেকদিন ধরেই ককবরক ভাষায় সাহিত্যের চর্চা ও বই প্রকাশ হয়ে আসছে। এর ফলে ককবরক ভাষার প্রসার অনেকটাই সুনিশ্চিত হয়েছে। ককবরক ভাষার উপরে বর্তমানে বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষও গবেষণা এবং চর্চা করছেন। ককবরক ভাষার প্রচার ও প্রসারে বিভিন্ন ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে রাজ্য সরকার।
মাধ্যমিক থেকে মাস্টার ডিগ্রি পর্যন্ত বোর্ডের পরীক্ষায় ককবরকে সর্বোচ্চ স্থানাধিকারীদের সম্মাননা জানানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ককবরক ভাষা ও সাহিত্যে উল্লেখযোগ্য অবদানের জন্য দুটি স্মৃতি পুরস্কার চালু করা হয়েছে। ককবরক ভাষায় শিক্ষা গ্রহণে চাকরি ও রোজগারের নিশ্চয়তা এসেছে। প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত ৪৫টি বিদ্যালয়কে প্রাথমিকভাবে ককবরক ভাষা চালু করা হয়েছে।
মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের ককবরক ভাষা চর্চার বিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। টিআরবিটি’র মাধ্যমে পিজিটি শিক্ষক নিয়োগে অনেক কৃতিরা উঠে আসছেন। টিপিএসসি’র মাধ্যমে ২২ জন সহকারী অধ্যাপক নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ককবরক ভাষা ও অন্যান্য সংখ্যালঘু ভাষা অধিকার এর তরফে ককবরক ভাষা প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ককবরক শিক্ষা প্রদানে শিক্ষকের সহায়তায় ককবরক টিচার্স হ্যান্ড বুক প্রকাশ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ককবরক এর পাশাপাশি অন্যান্য ভাষার প্রসারে সরকার আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছে। গবেষণার সুযোগ সম্প্রসারিত হয়েছে। নিয়োগের ক্ষেত্রেও প্রাধান্য পাচ্ছে ককবরক ভাষা। সরকারি প্রেস রিলিজ, সরকারি প্রকল্পের প্রচারেও ককবরক ভাষা যুক্ত হয়েছে।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে জনজাতি কল্যাণ দপ্তরের মন্ত্রী মেবার কুমার জমাতিয়া বলেন, ত্রিপুরা সহ দেশের বাইরেও ককবরক ভাষা চর্চা বিদ্যমান। সব মিলিয়ে প্রায় ১৫ থেকে ২০ লক্ষ মানুষ এই ভাষায় কথা বলে। এর এক গৌরব উজ্জ্বল অতীত রয়েছে।
সমৃদ্ধ ককবরক ভাষায় বস্তুভেদে গণনা পদ্ধতিও অভিনব। রাজ্য সরকার ককবরক ভাষার প্রচার ও প্রসারে একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে। বাইশটি সাধারণ ডিগ্রী কলেজর ককবরক সহকারি অধ্যাপক নিয়োগ এর উদ্যোগ এক উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ।
প্রতি বছর ভালো সংখ্যায় ছাত্রছাত্রীরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ককবরক বিষয়ে মাস্টার ডিগ্রী সম্পন্ন করছেন। অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ককবরক উপদেষ্টা কমিটির চেয়ারম্যান, বিধায়ক ডা. অতুল দেববর্মা, ট্রাইবেল রিসার্চ কালচারেল ইনস্টিটিউট এর অধিকর্তা আনন্দহরি জমাতিয়া, ককবরক ভাষা ও অন্যান্য সংখ্যালঘু ভাষা দপ্তরের অধিকর্তা দশরথ দেববর্মা প্রমুখ।
).push({});