।।তুহিন আইচ।। রক্ত-মাংসে গড়া মানুষের শরীর একদিন বিকল হলেই জীবনের ছন্দ বিঘ্নিত হয়। প্রাণের স্পন্দন বেসুরো হয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানের অপ্রতিহত অগ্রগতি রোগ মুক্তির বার্তা নিশ্চিত করছে জনজীবনে। প্রতিদিন, প্রতিক্ষণ কঠিন থেকে কঠিনতর রোগ থেকে নিষ্কৃতির বার্তা বয়ে আনছে চিকিৎসা বিজ্ঞান এগুলি সবই ঠিক। কিন্তু বর্তমান সময়ে অনেক ক্ষেত্রেই চিকিৎসা হয়েছে ব্যয় বহুল।
অনেকসময়ই সাধারণের সাধ্যের বাইরে থাকে। চিকিৎসার ব্যয় অনেক ক্ষেত্রেই জীবন ও মরণের মাঝে নির্ণায়ক হয়ে দাঁড়ায়। ঠিক এমনটাই যেন ঘটে গিয়েছিল কমলপুরের পুরাতন মোটর স্ট্যান্ডের বাসিন্দা প্রদীপ বসুর জীবনে। আকস্মিক হৃদরোগ প্রদীপ বাবুর জীবন অনিশ্চিত করে তোলে। তাৎক্ষনিক তিনটি স্ট্যান্ট বুকে বসালে তবেই জীবন বাঁচে এমন অবস্থা। কিন্তু বাধ সাধে অর্থ। চিকিৎসার ব্যয় স্বল্প আয়ের প্রদীপবাবুর সাধ্যের বাইরে।
ঠিক এই অবস্থায় সরকারি হাসপাতাল থেকে প্রদত্ত আয়ুষ্মান কার্ড আশীর্বাদস্বরূপ উপস্থিত হয়। আগরতলার একটি বেসরকারি হাসপাতালে প্রদীপ বসুর বুকে বসানো হয় তিনটি স্ট্যান্ট। ব্যয় হয় চার লক্ষ পচিশ হাজার টাকা। পুরো টাকাই আয়ুষ্মান কার্ডের মাধ্যমে প্রদান করা হয়। নতুন জীবন ফিরে পান প্রদীপ বসু। প্রদান করা হয়। এই কার্ডের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বছরে পাঁচ লক্ষ টাকা পর্যন্ত চিকিৎসার ব্যয় বাবদ সুবিধা পেয়ে থাকেন। এই কার্ড করতে কোন প্রকার অর্থ ব্যয় করতে হয় না। প্রকৃত অর্থে এইটি হল সরকারিভাবে স্বাস্থ্যবীমা।
আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্পের কথা জানতে পেরে প্রদীপ বসু, উনার স্ত্রী রীতা বসু ও ছেলে অলকেশ বসু এই প্রকল্পের ই-কার্ডের জন্য নিজেদের নাম নথিবদ্ধ করেন। সে সময় তারা ধারণাও করেননি যে এই আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্পের ই-কার্ড তাদের পরিবারের মরণাপন্ন এক সদস্যের জীবন ফিরিয়ে দেবে। গত ৩ সেপ্টেম্বর ভোট পাচটা। প্রদীপ বাবু অস্বস্তি অনুভব করতে শুরু করেন। পেটে কামড় দেওয়া ব্যাথা। সঙ্গে বুক ব্যথা, শ্বাস কষ্ট। ব্যথা ও অস্বস্তি যখন সহ্যক্ষমতার বাইরে তখন স্ত্রী ও ছেলেকে ডাকেন। নিয়ে যাওয়া হয় কমলপুর হাসপাতালে। ই সি জি-তে হৃদযন্ত্রের সমস্যা সনাক্ত হয়। এরপর প্রদীপবাবু ধীরে ধীরে নিস্তেজ হতে থাকেন। এক সময় পড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। তিনি বলেন, এর পরের ঘটনা কিছুই আর বলতে পারেন নি। স্ত্রী রীতা বসু জানান, অবস্থা বেগতিক দেখে কমলপুর হাসপাতালের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. সঞ্জয় দাস তাকে আগরতলায় বেসরকারি হাসপাতালে রেফার করেন।রীতা দেবী বলছিলেন তিনি এবং ছেলে মাত্র দুই হাজার টাকা নিয়ে আগরতলা রওনা হন। কিভাবে চিকিৎসা হবে সে ব্যাপারে তারা তখন সম্পূর্ণ অন্ধকারে।
যাইহোক বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে গেলে তারা জানান জরুরীকালীন তিনটি স্ট্যান্ট বসাতে হবে বুকে। হৃদযন্ত্রে তিনটি ব্লকেজ। ব্যয় হবে চার লক্ষের উপর। এই কথা শুনে স্ত্রী ও ছেলের মাথায় হাত। রোগীর জীবন নিয়ে ভাববেন না টাকার সংস্থান করবেন এই ভাবনায় আকুল অবস্থা মা, ছেলের। ঠিক এই সময়টাতে জাদুকাঠির ন্যায় হাজির হয় আয়ুষ্মান কার্ড। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাদের কার্ডের মাধ্যমে চিকিৎসা করা যাবে বলে জানান। কিন্তু কার্ড তারা নিয়ে যান নি। এরপর আধার নম্বরের মাধ্যমে কার্ডের নথিবদ্ধকরণের তথ্য পেয়ে যান। স্ট্যান্ট বসানো হয়। নতুন জীবন পান প্রদীপ বসু। চিকিৎসা বাবদ এক টাকাও আর নিজেদের ব্যয় করতে হয় নি বলে জানান ছেলে অলকেশ। এইভাবে সরকারি স্বাস্থ্যবীমার সুবিধা পেয়ে আজ বসু পরিবারটি আপ্লুত।
‘আয়ুষ্মান কার্ড না থাকলে আজ আমি আর এই পৃথিবীতে থাকতাম না’। এই কথা বলার সময় চোখে জল প্রদীপ বসুর। স্ত্রী রীতা দেবী বলেন, প্রচন্ড অর্থ কষ্টের মধ্যে এই ব্যয়বহুল চিকিৎসা করে কোনভাবেই স্বামীকে বাঁচাতে পারতেন না তিনি। যদি না আমাদের কাছে আয়ুষ্মান ভারতের ই-কার্ড থাকতো। আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্পে ই-কার্ড প্রদীপ বসুর জীবনে নতুন প্রাণের ছন্দ সঞ্চারিত করেছে।