অনলাইন ডেস্ক, ২০ নভেম্বর।। বিয়ে ছাড়াই একসঙ্গে থাকাকে ইরানে বলা হয় ‘হোয়াইট ম্যারেজ’ বা সাদা বিয়ে। ইরানী সমাজের কড়া ইসলামী আইনে নারী-পুরুষের এভাবে একসাথে থাকা- বিয়ে ছাড়া যৌন সম্পর্কের মতোই- অবৈধ। কিন্তু তারপরও দেশটিতে এই সাদা বিয়ে বেড়ে চলছে।
ইরানে এখন বিয়ের আগেই একসাথে থাকছে এমন তরুণ যুগলের সংখ্যা কত তার কোন সরকারি হিসেব নেই।
কিন্তু এটা ক্রমশঃই সাধারণ ব্যাপারে পরিণত হচ্ছে, এবং ইরানের কট্টরপন্থী প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠছে।
বেশ কয়েক বছর আগে বিবিসির ফারসি বিভাগের রানা রহিমপুর এক রিপোর্টে লিখেছিলেন, ইরানে এই ‘সাদা বিয়ে’র প্রচলন এতটাই বেড়ে গেছে যে দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়তুল্লাহ আলি খামেনি এক বিবৃতি দিয়ে এ ব্যাপারে তার ‘গভীর আপত্তি’ প্রকাশ করেছিলেন।
তার কার্যালয়ের প্রধান মোহাম্মদ মোহাম্মদী গোলপেগানির ইস্যু করা এক বিবৃতিতে কর্মকর্তাদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছিল ‘কোহ্যাবিটেশন’ বা বিয়ে না করে একসঙ্গে থাকার বিরুদ্ধে ‘ব্যবস্থা নেবার ক্ষেত্রে যেন কোন দয়া প্রদর্শন করা না হয়’।
তাতে বলা হয়েছিল, ‘পুরুষ ও নারীর বিয়ে না করে একসাথে থাকা লজ্জাজনক। যেসব লোকেরা এ জীবন বেছে নিয়েছে তাদের একটি বৈধ প্রজন্মকে অবৈধ প্রজন্ম দিয়ে মুছে দিতে বেশি সময় লাগবে না’।
কিন্তু এসব সতর্কবাণী ইরানের তরুণ প্রজন্ম শুনছে বলে মনে হচ্ছে না। এ শতাব্দীর প্রথম দশকেও ইরানে কোন যুবক-যুবতী সাদা বিয়ে করবে এমনটা অকল্পনীয় ছিল। কিন্তু এখন এরকম অবিবাহিত দম্পতির সংখ্যা ক্রমশঃই বাড়ছে।
ইরানী নারীদের মধ্যে জনপ্রিয় সাময়িকী ‘জানান’ ২০১৪ সালে এ বিষয়টি নিয়ে একটি বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করেছিল।
তবে এর কয়েক মাস পর ২০১৫ সালের এপ্রিলে কর্তৃপক্ষ ‘বিয়ে না করে একসাথে থাকাকে উৎসাহিত করার’ অভিযোগে ম্যাগাজিনটি নিষিদ্ধ করে।
এ ব্যাপারে ঠিক কি করা যায় – এ নিয়ে ইরানি কর্তৃপক্ষ একটা দ্বিধায় আছে বলেই মনে হয়। ইরানের যুব বিষয়ক ডেপুটি মন্ত্রী মোহাম্মদ মেহদি তন্দগোইয়ান সম্প্রতি বার্তা সংস্থা ইরনাকে বলেছেন, ‘অবিবাহিত যুগলদের সন্তানদের একসময় তাদের জন্ম নিবন্ধন সনদ দরকার হবে- যখন তারা স্কুলে ভর্তি হতে যাবে’।
তিনি সতর্ক করে দেন যে বিষয়টির নিষ্পত্তি করতে ব্যর্থ হবার পরিণাম হবে বিপর্যয়কর।
ইরানে বিয়ের অনুষ্ঠান প্রায়ই ব্যয়বহুল হয়, আর এর খরচ দিতে হয় বরের পরিবারকে। আর বিয়ে ভেঙে গেলে স্ত্রীকে ‘মাহরিয়েহ’ হিসেবে যে অর্থ দিতে হয় – তাও দিতে হয় স্বামীকে। এর অংক হয় বেশ বড়, আর তা না দিতে পারলে জেলে যাবার সম্ভাবনা থাকে।
অধিকাংশ পর্যবেক্ষকই মনে করেন, ইরানে অনেক যুগলই তাড়াহুড়ো করে বিয়ে করতে চায় না এর কারণ হচ্ছে দেশটির ক্রমবর্ধমান বিবাহবিচ্ছেদের হার।
ইরানের একজন সমাজকল্যাণ সংস্থার একাংশের পরিচালক ফারহাদ আঘতার বলছেন, ইরানে প্রতি পাঁচটি বিয়ের একটি বিবাহবিচ্ছেদ হয়। সারা ইরানের মধ্যে রাজধানী তেহরানে বিবাহবিচ্ছেদের হার সবচেয়ে বেশি।
ইরানী সমাজবিজ্ঞানী মেহেরদাদ দারভিশপুর – যিনি এখন সুইডেনে থাকেন – বলছিলেন, ‘এটা বলতেই হবে যে ইরানের সমাজের অধিকতর ধার্মিক অংশ বিয়ে ছাড়া নারীপুরুষের একসাথে থাকা গ্রহণ করে না’।
‘কিন্তু বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতই ইরানের মধ্যবিত্ত শ্রেণী ধীরে ধীরে ঐতিহ্যগত বিয়ের তুলনায় এটাকেই বেশি পছন্দ করতে শুরু করেছে। বিয়ের আগে যৌন সম্পর্ক এখন আর কোন ‘ট্যাবু’ নয়’, বলেন তিনি।
ইরানের আইনে বিয়ের বাইরে কোন নারী-পুরুষের শারীরিক সংস্পর্শ ঘটলে তা দণ্ডনীয় অপরাধ – যার জন্য ৯৯টি বেত্রাঘাতের মত শাস্তির বিধান রয়েছে।
একারণে যে যুগলরা এরকম সাদা বিয়ে করেছেন -তারা এটা নানাভাবে গোপন রাখেন যাতে লোকের চোখে তা ধরা না পড়ে।
ইরানের আইনজীবী ও নারী অধিকারকর্মী মেহরাঙ্গিজ কারের কথায় ‘একটা বড় সমস্যা হলো, বিয়ে ছাড়া একসঙ্গে থাকাটা যেহেতু বেআইনি – তাই কোন সমস্যা হলে এসব যুগলদের আইনি সহযোগিতা পাবার সুযোগ নেই’।
‘সাদা বিয়ে করেছেন এমন কোন নারী যদি অত্যাচারিত হন তাহলে তিনি পুলিশের কাছে যেতে পারেন না, কারণ তাহলে তিনি ও তার সঙ্গী উভয়কেই ব্যাভিচারের দায়ে গ্রেফতার করা হবে’।