Rubber Mission: মুখ্যমন্ত্রী রাবার মিশন রাজ্যের উন্নয়নের দিশায় সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত

।। মানিক মালাকার ।। প্রকৃতি এই রাজ্যকে সাজিয়ে রেখেছে তার অফুরন্ত সম্পদ দিয়ে। মাটির উপরে যেমন রয়েছে, তেমনি মাটিরে নিচেও রয়েছে সেই সম্পদ। রাজ্যটি ছোট হতে পারে কিন্তু বৈচিত্রময় প্রাকৃতিক সম্পদের দিক দিয়ে কোন অংশেই কম নয়।

এই রাজ্যের সবুজ বনভূমি, মাটি-জল হাওয়া ও প্রাকৃতিক পরিবেশ সব কিছুতেই লুকিয়ে রয়েছে আত্মনির্ভরতার ভিত্তি। এই রাজ্যের রাবার, চা, বাশ, ও মাটির নিচে গ্যাস প্রকৃতির নিজস্ব সম্পদ। এই সম্পদকে ব্যবহার করে এগিয়ে চলার চাবিকাঠি রয়েছে আমাদের নিজেদের হাতেই। রাবার এই রাজ্যের অন্যতম অর্থকরী প্রাকৃতিক সম্পদ।

ত্রিপুরায় রাবার চাষ শুরু হয়েছিল ১৯৬৩ সালে। গুণমানে ত্রিপুরায় উৎপন্ন রাবারের কদর সারাদেশের সঙ্গে বিদেশেও সমাদৃত। কেরালার পরেই ত্রিপুরার রাবারের গুণগত উৎকর্ষতা রয়েছে। এজন্যই এগিয়ে এসেছে ভারত সরকারের শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রক, রাবার বোর্ড এবং অটোমোটিভ টায়ার ম্যানুফেকচার অ্যাসোসিয়েশন (এটিএমএ)।

রাজ্যের রাবারকে কাজে লাগিয়ে টায়ার শিল্প গড়ে তোলার জন্য এটিএমএ উত্তর-পূর্ব ভারতে আগামী পাঁচ বছরে ২ লক্ষ হেক্টর এলাকায় রাবার গাছ লাগানোর লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে। ত্রিপুরাতেও এই কর্মসূচিতে আগামী পাঁচ বছরে ৩০ হাজার হেক্টর এলাকায় রাবার গাছ লাগানোর জন্য রূপরেখা এখন চুড়ান্ত। তাই এই রূপরেখাকে সামনে রেখেই রাজ্যে চালু হয়েছে ‘মুখ্যমন্ত্রী রাবার মিশন প্রকল্প’।

গত ১৪ আগষ্ট,২০২১ সিপাহীজলা জেলার পাথালিয়াঘাটে মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব কুমার দেব আনুষ্ঠানিকভাবে মুখ্যমন্ত্রী রাবার মিশন প্রকল্পের সূচনা করেন। সূচনা অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী রাবার মিশন প্রকল্পের ফলে রাজ্যে বড়মাত্রায় রোজগার সৃষ্টি করার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়ার কথা জানান। এই প্রকল্পের মাধ্যমে ধাপে ধাপে রাবার বাগান তৈরীতে সুবিধাভোগীদের নানাভাবে সহায়তা কথাও মুখ্যমন্ত্রীর কথায় ফুটে উঠে।

মুখ্যমন্ত্রী রাবার মিশন প্রকল্পটি রূপায়নে জনজাতি কল্যাণ দপ্তর নোডাল দপ্তর হিসেবে কাজ করছে।জনজাতি কল্যাণ দপ্তরের সচিব তনুশ্রী দেববর্মা এই প্রকল্পের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানাতে গিয়ে বলেন, মুখ্যমন্ত্রী রাবার মিশনের মূল লক্ষ্য হচ্ছে, আগামী পাঁচ বছরে রাবার গাছ লাগানো বৃদ্ধি করা এবং স্বাভাবিকভাবেই রাবারের উৎপাদন বৃদ্ধি ঘটানো।

রাজ্যে উপলব্ধ পাট্টাভূমি, জোত জমি, অ্যালটি জমি, পুনরায় রোপন করা যাবে এমন জমিতে এবং বর্তমানে ত্রিপুরা রাবার বোর্ড, টিএফডিপিসি লিমিটেড, টিআরপিসি লিমিটেড, টিটিএএডিসি, টিআরপি ও পিটিজি দপ্তর, জনজাতি কল্যাণ দপ্তর পরিচালিত জরাজীর্ণ বাগানগুলিতেই মুখ্যমন্ত্রী রাবার মিশন প্রকল্পের রূপায়ন হবে।

জানা গেছে, এই প্রকল্পে আগামী পাঁচ বছরে রাবার চাষের লক্ষ্যমাত্রার মোট ৩০ হাজার হেক্টরের মধ্যে টিআরপিসি লিমিটেড, টিএফডিপিসি লিমিটেড, টিটিএএডিসি, রাবার বোর্ড, জনজাতি কল্যাণ দপ্তর ও আদিম জাতি উন্নয়ন দপ্তরসহ মোট ৬টি দপ্তর ৫ হাজার হেক্টর করে মোট ৩০ হাজার হেক্টর এলাকায় রাবার গাছ লাগানোর পরিকল্পনা নিয়েছে।

ইতিমধ্যেই এই প্রকল্পে ৬৯৫ হেক্টর এলাকায় ৩ লক্ষ ১২ হাজার ৭০২টি রাবারের চারা লাগানো হয়েছে। দপ্তরের সচিব আরও জানান যে, এই প্রকল্পে প্রতি হেক্টর এলাকায় রাবার বাগান সৃষ্টি করতে ব্যয় হবে ৩ লক্ষ ৫ হাজার ৪৫২ টাকা।

এই মিশনের অধীনে আগামী পাঁচ বছরে ৬০ হাজার জন সুবিধাভোগী উপকৃত হবেন বলে তিনি আশাব্যক্ত করেন। সুবিধাভোগীরা যাতে এই প্রকল্পের আর্থিক সহায়তা পায় তারজন্য ক্রেডিট লিঙ্ক মডেল এবং ইনপুট সাবসিডি মডেল হাতে নেওয়া হয়েছে। ক্রেডিট মডেলে কোন সুবিধাভোগী ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ নিয়ে রাবার বাগান করলে ৪৯,০৭৮ টাকা পর্যন্ত সুদের উপর সাবসিডি দেওয়া হবে।

ইনপুট সাবসিডি মডেলের ক্ষেত্রে এটিএমএ থেকে প্রাপ্ত আর্থিক সহায়তার মাধ্যমে প্রকল্পের বিভিন্ন উপকরণ যেমন- চারা রোপন সম্বন্ধীয় বিভিন্ন সামগ্রী, বেড়া দেওয়া, সার দেওয়ার সরঞ্জাম ইত্যাদি সুবিধাভোগীকে দেওয়া হবে৷ রাবার বর্তমান মানব জীবনের একটি অপরিহার্য অংশ।

আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত অনেক জিনিসই প্রাকৃতিক রাবার থেকে তৈরী হয়। চাহিদাও ক্রমবর্ধমান। রাবারের এই ব্যবহারিক চাহিদার দিকটির প্রতি গুরুত্ব দিয়েই রাবার উৎপাদন বৃদ্ধিতে গুরুত্ব আরোপ করেছে রাজ্য সরকার।

বর্তমানে ত্রিপুরা দেশে কেরালার পরে দ্বিতীয় বৃহত্তম রাবার উৎপাদক রাজ্য। রাজ্যে বর্তমানে ৮৬,৮৯২ হেক্টর এলাকায় রাবার চাষ করা হচ্ছে। রাবারের আর্থিক দিকটিকে লক্ষ্য রেখে বর্তমানে রাজ্যের ১ লক্ষ ১০ হাজারের মতো চাষী এখন রাবার চাষে যুক্ত রয়েছেন।

তাদের আন্তরিক প্রয়াসে ২০২০-২১ অর্থবছরে রাজ্যে ৯০ হাজার ৭২০ মেট্রিক টনের মতো রাবার রাজ্যে উৎপাদিত হয়েছে। বর্তমানে ত্রিপুরাতে প্রতি কেজি রাবারের বাজার মূল্য ১৪৫ টাকা থেকে ১৭০ টাকা। রাবার বাগান থেকে আয় বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে রাবার শিল্পের পরিকাঠামো উন্নয়নের উপরও রাজ্য সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে।

রাজ্যে বর্তমানে ১১,৫০০টি ব্যক্তিগত, ২১২টি সমষ্টিগত এবং প্রায় ৬০টি প্রসেসর বা ডিলার রাবার প্রসেসিং ইউনিট রয়েছে। এছাড়াও আই এস আর ফ্যাক্টরী ৮টি, সেনেক্স তৈরীর ফ্যাক্টরী ৮টি, রাবার কাঠ প্রসেসিং ফ্যাক্টরী ২টি এবং রাবার পণ্য উৎপাদন ফ্যাক্টরী রয়েছে ৫টি।

রাজ্যে রাবারকে কাজে লাগিয়ে শিল্প উন্নয়নের সম্ভাবনার ক্ষেত্রটিকে প্রশস্ত করতে আত্মনির্ভর ত্রিপুরা গঠনের যে আহ্বান মুখ্যমন্ত্রী রেখেছেন তা বাস্তবায়নের দিকেই এগুচ্ছে ত্রিপুরা। মুখ্যমন্ত্রী রাবার মিশন প্রকল্প আগামী দিনে রাজ্যে শিল্প উন্নয়নের বিভিন্ন দিককে প্রশস্ত করার একটি অন্যতম পদক্ষেপ।

 

You May Also Like

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চ্যাট খুলুন
1
আমাদের হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠান
হেলো, 👋
natun.in আপনাকে কিভাবে সহায়তা করতে পারে?