Appreciate: রাজ্যের ত্রিপুরেশ্বরী ব্র্যান্ডের চায়ের কদর বাড়ছে চা পিপাসু মানুষের কাছে

।। মানিক মালাকার ।। সকালে গরম চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিয়ে খবরের কাগজ পড়া বহুদিনের অভ্যাস। শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা বছরের সব সময়েতেই চা-এর কদর বিশ্বজনীন। পড়শী রাজ্য আসাম আর দার্জিলিং এর চা স্বাদে গন্ধে অতুলনীয় হলেও আমরাও কোন অংশে পিছিয়ে নেই। সবার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে রাজ্যের ত্রিপুরেশ্বরী ব্র্যান্ডের চায়ের কদর বাড়ছে চা পিপাসু মানুষের কাছে। বাঁশ, রাবার, উদ্যানজাত সামগ্রীর পাশাপাশি চা এই রাজ্যের নিজস্ব অর্থকরী সম্পদ আত্মনির্ভর ত্রিপুরা গড়ে তুলতে গেলে এইসব প্রাকৃতিক অর্থকরী সম্পদের যথাযথ ব্যবহার প্রয়োজন।

২০১৮ সালে সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর এই রাজ্যের নিজস্ব সম্পদকে ব্যবহার করে স্ব-নির্ভরতার পাশাপাশি রাজ্যের আর্থিক বুনিয়াদকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। আর গত তিন বছরেই এর সুফল ফলতে শুরু করেছে। বর্তমান রাজ্য সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করার পর রাজ্যের আধা সরকারী সংস্থাগুলিকে লাভজনক সংস্থায় পরিণত করার প্রচেষ্টা নেয়।

১৯৮০ সালের ১১ আগষ্ট ত্রিপুরা চা উন্নয়ন নিগম গঠিত হলেও ২০১৮ সাল থেকে নবগঠিত ত্রিপুরা চা উন্নয়ন নিগম রাজ্যের চা শিল্পের পুনরুজ্জীবনে বহুবিধ যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে। নিগমের চেয়ারম্যান সন্তোষ সাহা জানালেন, ইচ্ছাশক্তির পাশাপাশি পরিচালনগত কর্মকৌশলতার কারণে চা উন্নয়ন নিগম আজ একটি লাভজনক সংস্থায় পরিণত হয়েছে। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী আত্মনির্ভর ত্রিপুরা গড়ার যে আহ্বান রেখেছেন তা বাস্তবায়িত করতে চা উন্নয়ন নিগমের বলিষ্ঠ প্রয়াস জারি রয়েছে।

চা উন্নয়ন নিগমের বর্তমান চেয়ারম্যান সন্তোষ সাহা জানান, রাজ্য সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ এবং রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর বিভিন্ন পরামর্শে চা উন্নয়ন নিগম সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। রাজ্যের চা শিল্পকে লাভজনক শিল্পে পরিণত করার লক্ষ্যে নিগমের কর্মপরিধি ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বেসরকারী ব্যক্তি মালিকানার ছোট ছোট চা বাগান গড়ে তোলার উপর নিগম জোর দিয়েছে।

রাজ্যের জলবায়ু ও মাটি চা-চাষের সহায়ক। আর একে কাজে লাগিয়েই রাজ্যে গড়ে তোলা হচ্ছে চা বাগান। রুগ্ন বাগানগুলিকে সতেজ করার প্রয়াস চলছে। সবুজে সবুজ আর নীলিমায় নীল যে কোন পর্যটকের কাছেই এক লোভনীয় আকর্ষণ।প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর রাজ্যের চা বাগানগুলি পর্যটকদের কাছে অন্যতম আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। তাই একই সঙ্গে দুটো বিষয়কে যুক্ত করে খুলে যাচ্ছে উন্নয়নের নতুন দিশা।

কমলাসাগর, দূর্গাবাড়ি কিংবা উত্তর ও উৎকোটি জেলার চা বাগানগুলি সারা বছরই হয়ে উঠতে পারে ভ্রমণ পিপাসু মানুষের কাছে বেড়ানোর নতুন গন্তব্য। ভবিষ্যতে আরো নানাবিধ কর্ম পরিকল্পনা নিয়ে এগুচ্ছে ত্রিপুরা চা উন্নয়ন নিগম। রাজন্য আমল থেকেই রাজ্যে চা বাগানের গোড়াপত্তন। ১৯১৬ সালে তৎকালিন মহারাজা বীরেন্দ্র কিশোর মাণিক্য বাহাদুরই সর্বপ্রথম ত্রিপুরায় চা চাষের জন্য অনুমতি প্রদান করেছিলেন।

সে বছরই কৈলাসহরের হীরাছড়া চা বাগানটি রাজ্যের প্রথম চা-বাগান হিসেবে গড়ে উঠে। সেই থেকেই সূচনা। বাড়তে থাকে বাগানের সংখ্যা। বর্তমানে রাজ্যে ৫৪টি বড় চা বাগান রয়েছে, যার জমির পরিমান প্রায় ১২,৮০০ হেক্টর। এছাড়াও রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে রয়েছে বেশ কিছু ক্ষুদ্র চা-বাগান।

বর্তমানে রাজ্যের চা শিল্পে স্থায়ী ও অস্থায়ী কর্মী রয়েছেন প্রায় ১৫ হাজার। বর্তমানে চা উন্নয়ন নিগমের অধীনে ৩টি চা বাগান ও ২টি চা তৈরির কারখানা রয়েছে। বিগত বছরগুলির তুলনায় নিগমের কারখানাগুলিতে তৈরি চা পাতা উৎপাদনও অনেকাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে রাজ্যে চা শিল্পের উন্নয়ন যেমন ঘটছে তেমনি চা’কে কেন্দ্র করে ব্যাপক কর্মসংস্থানেরও সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে।

ত্রিপুরা চা উন্নয়ন নিগমের চেয়ারম্যান সন্তোষ সাহা জানান, ২০১৭ সালে নিগমের কারখানাতে তৈরি চা পাতা উৎপাদন হতো ১ লক্ষ ৭২ হাজার কেজি। ২০১৮ সাল থেকে তা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেয়ে ২০২০ সালে হয়েছে ৪ লক্ষ ৪৫ হাজার কেজি।শুধু উৎপাদন নয় নিগমে ব্যবসাজনিত লেনদেনও বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৭-১৮ অর্থবর্ষে যেখানে নিগমের আয় ছিল ৩ কোটি ৬৪ লক্ষ ৮৭ হাজার টাকা তা 2020-21 অর্থবর্ষে বেড়ে হয়েছে ১০ কোটি ৫০ লক্ষ ৭৫ হাজার টাকা।

ত্রিপুরা চা উন্নয়ন নিগম গত তিন বছরে যে সব উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নিয়েছে তার মধ্যে রয়েছে চা উন্নয়ন নিগম ত্রিপুরা চায়ের লোগো চালু করা, ২০১৮ সালে নিগমের নতুন বোর্ডের উদ্যোগে ত্রিপুরা চা নিগমের প্যকেটজাত চা ‘ত্রিপুরেশ্বরী টি’ নামে নামকরণ, আগরতলা বীরচন্দ্র স্টেট সেন্ট্রাল লাইব্রেরিতে একটি ‘টি কর্ণার চালু করা, ২০১৯ সালে চা উন্নয়ন নিগম খাদ্য দপ্তরের সহযোগিতায় রেশন সপের মাধ্যমে চা-পাতা বিক্রয়। নতুন নামে ও নতুন লোগো নিয়ে ত্রিপুরার চা এখন নতুন আঙ্গিকে মর্যাদা লাভ করে রাজ্যবাসীর কাছে এমন কি বহির্রাজ্যেও সমাদৃত।

উদ্দেশ্য একটাই বিশ্ববাজারে ত্রিপুরাকে তুলে ধরা। ত্রিপুরা চা-এর গুণগত মান বৃদ্ধি পাওয়ায় ২০২০ সালে কলকাতা নিলাম বাজারে সর্বোচ্চ ২৭৪ টাকা প্রতি কেজি দরে নিগমের চা পাতা বিক্রি হয়েছে। নিগমের চা নিলামের ইতিহাসে এই দর একটি দৃষ্টান্তমূলক বলা যেতেই পারে। নিগম উৎপাদিত চা অধিক সংখ্যায় প্যাকেটজাত করণের লক্ষ্যে দূর্গাবাড়ি চা প্রক্রিয়াকরণ কারখানার মধ্যে দুটি অত্যাধুনিক প্যাকেটিং মেশিন স্থাপন করা হয়েছে।

ঘন্টায় ১৫০০ প্যাকেট তৈরির ক্ষমতা রয়েছে প্রতিটি মেশিনের। ২০১৮-১৯, ২০১৯-২০ ও ২০২০-২১ সালে এম জি এন রেগার মাধ্যমে ত্রিপুরা চা উন্নয়ন নিগমের তত্ত্বাবধানে ত্রিপুরার বিভিন্ন জেলায় প্রায় ৩২৫ একর চা বাগিচা তৈরি করা হয়েছে যার ফলস্বরূপ ৩টি কো-অপারেটিভ চা বাগান সহ ১৭২ জন ব্যক্তি উপকৃত হয়েছেন।

এই কাজে যুক্ত বিভিন্ন মহকুমার সমবায় সমিতি এবং প্যাকস ও ল্যাম্পসগুলিকে উৎসাহিত করতে চায়ের বিক্রির উপর প্রতি কেজি ৮টাকা সার্ভিস চার্জ দেওয়া হচ্ছে। ত্রিপুরা চা উন্নয়ন নিগম শুধু উৎপাদন বৃদ্ধি করাই নয়, লক্ষ্য রাখা হচ্ছে শ্রমিকদের কল্যাণেও। করোনা অতিমারির সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত চা শ্রমিকদের পাশে দাঁড়িয়েছে নিগম।

এই দুঃসময়ের মধ্যেও নিগমের চা বাগানগুলোর শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি করা হয়েছে। বর্তমানে নিগম চা শ্রমিকদের নগদ মজুরি ১০৫ টাকা থেকে বৃদ্ধি করে ১৩১ টাকা দিচ্ছে। বাগানের স্টাফ ও সাব-স্টাফদের ১৭ শতাংশ বেতন বৃদ্ধি করা হয়েছে। নিগম গত তিন বছরে যে সাফল্য অর্জন করেছে মুখ্যমন্ত্রী তার প্রশংসা করে এগিয়ে যাওয়ার উৎসাহ প্রদান করেন।

 

You May Also Like

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চ্যাট খুলুন
1
আমাদের হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠান
হেলো, 👋
natun.in আপনাকে কিভাবে সহায়তা করতে পারে?