স্টাফ রিপোর্টার, আগরতলা, ৮ আগস্ট।। সঠিক নিয়ম নীতি ও নিয়ত এই তিনটি ‘ন’-কে প্রাধান্য দিয়ে কাজ করছে রাজ্য সরকার। রাজনৈতিক রঙয়ের ঊর্ধে উঠে ঘরে ঘরে রোজগার তৈরির মাধ্যমে আত্মনির্ভর পরিবার তৈরি করে রাজ্যের অর্থনৈতিক মানোন্নয়ন সরকারের অগ্রাধিকারের ক্ষেত্র। বর্তমানে উল্লেখযোগ্য সাফল্যের জন্য বেশ কিছু ক্ষেত্রে ত্রিপুরা গোটা দেশে মার্গদর্শন করছে।
আজ জিরানীয়া আর ডি ব্লক, কৃষি মহকুমা ও এস এল বি সি-র উদ্যোগে আয়োজিত বিশেষ কৃষি ঋণ শিবিরের উদ্বোধন করে একথা বলেন মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব কুমার দেব। অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, কৃষকদের অর্থনৈতিক মানোন্নয়ন না করে দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। অন্নদাতাদের সার্বিক কল্যাণে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের গৃহীত বিভিন্ন প্রকল্পের সুফল পাচ্ছেন রাজ্যের কৃষকগণ।
কৃষকদের জন্য ঋণের ব্যবস্থা, বীমার মাধ্যমে ফসলের সুরক্ষা, ফসলের ক্ষতিপূরণ আদায়ের নিশ্চয়তা, সহায়কমূল্যে ধান ক্রয় ও কিষাণ রেলের সহায়তায় উৎপাদিত ফসল স্বল্প খরচে বহির্রাজ্যের বাজারে বিক্রির সুযোগ পাওয়ার ফলে রাজ্যের কৃষকদের আর্থিক মান উন্নত হচ্ছে। বেড়েছে কৃষকদের মাথাপিছু গড় আয়। সমাজের অন্তিম ব্যক্তি পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পের সুযোগ পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে রোজগার সুনিশ্চিত করার লক্ষ্যে কাজ করছে সরকার। আত্মনির্ভর পরিবার গড়ার লক্ষ্যেও বেশ কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
প্রকৃত সুবিধাভোগীরা যেন কোনওভাবেই বঞ্চিত না হন সেই বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে সবকা সাথ সবকা বিকাশের লক্ষ্যে সমস্ত অংশের নাগরিকদের কল্যাণে কাজ করছে সরকার। কেন্দ্রীয় বঞ্চনার অজুহাত না তুলে রাজ্য সরকারের গৃহীত বিভিন্ন প্রকল্পের ফলে ত্রিপুরা উন্নয়নের নিরিখে গোটা দেশে আজ নজির তৈরি করেছে। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে রাজ্যে কোভিড অতিমারী মোকাবিলায় বড়মাত্রায় টিকাকরণ সম্ভব হয়েছে।
কোভিড পরিস্থিতির মধ্যেও সরকারের সঠিক ব্যবস্থাপনার ফলে অনাহারে রাজ্যে একজন ব্যক্তিরও প্রাণহানি হয়নি। প্রয়োজন রয়েছে এমন পরিবারের জন্য রেশন সামগ্রী, নভেম্বর মাস পর্যন্ত কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্যোগে ৫ কেজি করে চাল প্রদান ও অন্যান্য প্রকল্পের সহায়তায় কোভিড অতিমারীর মধ্যে কারোরই অন্নের অভাব হয়নি।
গোটা দেশে প্রধানমন্ত্রী যে কোভিড টিকাকরণের উদ্যোগ নিয়েছেন সেই লক্ষ্য পূরণে কাজ করে চলেছে রাজ্য সরকার। জিরানীয়া মহকুমার প্রায় ৯৭ শতাংশ টিকাকরণ সম্পন্ন হয়ে গেছে ইতিমধ্যেই। এরজন্য এই অঞ্চলের সচেতন নাগরিকদের ধন্যবাদ জানান মুখ্যমন্ত্রী। বিগত দিনে একটা অংশ থেকে ত্রিপুরাকে পিছিয়ে পড়া রাজ্য হিসেবে পরিগণিত করা হতো।
কিন্তু বর্তমানে বিভিন্ন ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্যের জন্য গোটা দেশে পরিচিতি পাচ্ছে ত্রিপুরা আর্থিকভাবে অস্বচ্ছল পরিবারের ছেলেমেয়েদের উন্নত শিক্ষার কথা বিবেচনা করে সি বি এস ই বিদ্যালয় সহ মাত্র তিনমাসের মধ্যে এন সি ই আর টি পাঠক্রম চালু করেছে রাজ্য সরকার। এছাড়াও সমস্ত ক্ষেত্রে রাজ্য সরকারের সঠিক ব্যবস্থাপনায় উল্লেখযোগ্য সাফল্য এসেছে।
মুখ্যমন্ত্রী এদিন বর্তমান সরকারের সময়ে বিভিন্ন সাফল্যের খতিয়ান তুলে ধরে বলেন, অ্যানুয়েল ক্রেডিট প্ল্যান ৭২ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছে, এম এস এম ই সেক্টরে বিনিয়োগ বৃদ্ধি হয়েছে ৬৬ শতাংশ, প্রধানমন্ত্রী সুরক্ষা বীমায় বৃদ্ধি হয়েছে ৫২ শতাংশ, প্রধানমন্ত্রী জীবনজ্যোতি যোজনায় বৃদ্ধি হয়েছে ৩৪ শতাংশ, অটল পেনশন যোজনায় বৃদ্ধি হয়েছে ৩১৩ শতাংশ, প্রধানমন্ত্রী মুদ্রা যোজনায় বৃদ্ধি হয়েছে ৯৬.৬৯ শতাংশ, প্রধানমন্ত্রী ফসল বীমা যোজনায় বৃদ্ধি হয়েছে ১১০৯ শতাংশ। এক্ষেত্রে দাবি ও নিষ্পত্তির পরিমাণ বৃদ্ধি হয়েছে ২৫ শতাংশ।
এদিনের অনুষ্ঠানে বিভিন্ন সুবিধাভোগীদের হাতে কৃষি যন্ত্রপাতি, কিষাণ ক্রেডিট কার্ড, মাছের পোনা, শূকর ছানা সহ অন্যান্য সহায়তা তুলে দেন মুখ্যমন্ত্রী। অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বিধায়ক সুশান্ত চৌধুরী বলেন, রাজ্যের সর্বাঙ্গীন উন্নয়নে কৃষক থেকে শুরু করে সমস্ত অংশের নাগরিকদের সার্বিক বিকাশে নিরন্তর কাজ করে চলেছে রাজ্য সরকার।
কোভিড অতিমারীকে সামনে রেখে একটা সময়ে যখন গোটা দেশে মানব জীবন প্রায় স্তব্ধ ঠিক সেই সময়ে কৃষি ক্ষেত্রের উন্নয়নে বেশ কিছু প্রকল্প বাস্তবায়নে উদ্যোগ নিয়েছে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার। কৃষি ঋণের এই বিশেষ শিবিরে সহায়তায় রাজ্যের কৃষকরা লাভবান হবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
বিধায়ক সুশান্ত চৌধুরী বলেন, গ্রামীণ অর্থনীতির মূল ভিত কৃষকগণ। তারজন্য কৃষকদের আর্থসামাজিক উন্নয়ন সরকারের গুরুত্বের জায়গা। কিষাণ ক্রেডিট কার্ড সহ কৃষকদের কল্যাণে সমস্ত প্রকল্পের সহায়তায় আরও দ্রুত বাস্তবায়নের উপর গুরুত্ব আরোপ করেন তিনি।
কৃষি ও কৃষক কল্যাণ দপ্তরের সচিব সি কে জমাতিয়া বলেন, পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাঙ্ক, স্টেট ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়া, ত্রিপুরা গ্রামীণ ব্যাঙ্ক ও কানাড়া ব্যাঙ্ক এই চারটি ব্যাঙ্কের সহায়তায় এই বিশেষ কৃষি ঋণ শিবিরের আয়োজন করা হয়েছে। সমস্ত রাজ্যব্যাপী ৭০টি গ্রাম পঞ্চায়েত ও ভিসিতে একযোগে এই বিশেষ শিবিরের আয়োজন করা হয়েছে। যার মূল লক্ষ্য মৎস্যপালন, পশুপালন ও কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত সুবিধাভোগীদের মধ্যে দ্রুত বিভিন্ন সুবিধা পৌঁছে দেওয়া।
তিনি বলেন, ফসল বীমা যোজনা থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের কৃষক কল্যাণে গৃহীত বিভিন্ন প্রকল্পের সুবিধা পাচ্ছেন রাজ্যের কৃষকরা। কৃষকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সপ্তাহব্যাপী ফসল সুরক্ষা কর্মসূচির ব্যাপক সাড়া পাওয়া গেছে। কৃষকদের কল্যাণে গৃহীত বিভিন্ন প্রকল্পের ১০০ শতাংশ সুফল কৃষকদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে কাজ করছে কৃষি ও কৃষক কল্যাণ দপ্তর।
অনুষ্ঠানে পশ্চিম ত্রিপুরা জেলার জেলাশাসক দেবপ্রিয় বর্ধন বলেন, কোভিড অতিমারীর সমস্ত নিয়মবিধি মেনে আত্মনির্ভর ত্রিপুরা গড়ার লক্ষ্যে জনকল্যাণে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে রাজ্য সরকার। স্বনির্ভর পরিবারের মাধ্যমে আত্মনির্ভর ত্রিপুরা গড়ার লক্ষ্যে মৎস্য পালন, পশু পালন ও কৃষি কাজের মাধ্যমে জীবিকা ও অর্থনৈতিক মানোন্নয়নের লক্ষ্যে এই শিবির বিশেষ ভূমিকা নেবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে এস এল বি সির কনভেনার (ডিজিএম পি এন বি) আনন্ত কুমার বলেন, মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশিত পথে শুধুমাত্র ব্যাঙ্কের মধ্যে বসে না থেকে বিভিন্ন গ্রাম পঞ্চায়েত থেকে ভিসি এলাকা পর্যন্ত কৃষি ও অন্যান্য জীবিকা নির্ভর কাজে সহায়তার লক্ষ্যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এদিনের অনুষ্ঠানে অর্থ দপ্তরের সচিব ব্রিজেশ পান্ডে, গ্রামোন্নয়ন দপ্তরের সচিব সৌম্যা গুপ্তা, মৎস্য ও পশুপালন দপ্তরের সচিব দীপা নায়ার, পশ্চিম ত্রিপুরা জেলার জেলাশাসক দেবপ্রিয় বর্ধন, অর্থ দপ্তরের যুগ্ম সচিব বিশাল কুমার, জিরানীয়া পঞ্চায়েত সমিতির চেয়ারপার্সন প্রমুখ।