।। সঞ্জীব কুমার দাস ।। মাশরুমের স্পন বা বীজ তৈরি করার ল্যাবরেটরি গড়ে তোলে স্বনির্ভরতার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিলেন উত্তর ত্রিপুরা জেলার নীলোৎপল সিনহা। ধর্মনগর মহকুমার কালাছড়া ব্লকের দক্ষিণ হুরুয়া গ্রামে নীলোৎপল সিনহার বাড়ি। ৩৭ বছরের এই স্বউদ্যোগী যুবক বায়োসায়েন্সে স্নাতক৷ ইংরেজি ভাষায় অনর্গল কথা বলতে পারেন।
সরকারি চাকরির কথা জিজ্ঞেস করতেই জানালেন, লক্ষ্য ছিলো নিজের উদ্যোগে কিছু করে স্বনির্ভর হওয়া৷ সেই ইচ্ছাকেই সামনে রেখে এগিয়ে যাওয়া। সেই লক্ষ্যে প্রথমে মাশরুম চাষ শুরু করলেন।দিয়ে যাত্রা শুরু করেন। ২০১৮ সাল থেকে মাশরুমের বীজ উৎপাদন করা শুরু করলেন। প্রথমে তিনি নিজের বাড়িতেই মাশরুমের বীজ উৎপাদন করার জন্য ল্যাবরেটরি খোলেন।
বেকার যুবকদের স্বনির্ভর হওয়ার জন্য রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী যে অনুপ্রেরণা দিচ্ছেন তা অনুপ্রাণিত করেছে নীলোৎপল সিনহাকে। মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব কুমার দেব বিভিন্ন সময় তার বক্তব্যে রাজ্যের বেকার যুবকযুবতীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলতেন চাকুরী প্রত্যাশী না হয়ে স্বনির্ভর হয়ে উঠতে। স্বনির্ভর হওয়ার পাশাপাশি অন্যদের জন্যও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে।
এই কাজে সরকার বেকার যুবকযুবতীদের সবরকমের সহায়তা করবে। মুখ্যমন্ত্রীর আবেদনে উৎসাহিত নীলোৎপল সিনহা নিজের বাড়ির ল্যাবরেটরিতে উৎপাদন করা মাশরুম বীজ এখন রাজ্য এবং বর্হিরাজ্যে বাজারজাত হচ্ছে। তার মাশরুমের বীজ সংগ্রহ করে রাজ্যের এমনকি বহির্রাজ্যের অনেক মাশরুম চাষী স্বনির্ভর হতে পেরেছেন। নীলোৎপল সিনহার এই উদ্যোগ অনেক মাশরুমচাষীকে পরোক্ষভাবে কাজের সুযোগ করে দিয়েছেন।দক্ষিণ হুরুয়া গ্রামের নিলোৎপল সিনহা এখন শুধু নিজেই স্বনির্ভর নন মাশরুম চাষীদের তিনি কর্মসংস্থানেরও সুযোগ করে দিয়েছেন।
এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, শুরুতে তিনি মাশরুম চাষের জন্য বীজ বহিরাজ্য থেকে সংগ্রহ করতে হত। সেক্ষেত্রে কিছুটা প্রতিবন্ধকতা ছিলো। পরিবহণের সময় বীজের গুণগতমান অনেক সময় নষ্ট হয়ে যেতো। তাছাড়া দামও বেশি ছিলো এবং সময়মতো তা পাওয়াও যেতো না৷ এই প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়েই তিনি নিজ উদ্যোগেই গড়ে তোলেন মাশরুমের বীজ উৎপাদনের ল্যাবরেটরি। শুরুতে তিনি উদ্যানপালন ও ভূমি সংরক্ষণ দপ্তরের আধিকারিকদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ পেয়েছেন।
তাছাড়াও নিজের উদ্যোগে আরও কারিগরি কৌশল রপ্ত করেছেন। নিজের এই একাগ্রতা আজ তাকে সফল্য এনে দিয়েছে। বর্তমানে তার ল্যাবরেটরি থেকে প্রতি মাসে ২ টন মাশরুম বীজ উৎপাদন করছেন। প্রতি কুইন্টাল পাইকারি দরে ৮ হাজার টাকা মূল্যে বিক্রি করছেন। তিনি বছরে প্রায় ১৯ থেকে ২০ লক্ষ টাকার মাশরুম স্পন রাজ্যে ও বহির্রাজ্যে বিক্রি করছেন। স্থানীয় মাশরুম চাষীরা এখন তার কাছ থেকে মাশরুমের বীজ ক্রয় করছেন। মাশরুমের বীজের জন্য বর্হিরাজ্যের উপর নির্ভর করতে হচ্ছেনা। নীলোৎপল সিনহা ইতিমধ্যেই অনেক মাশরুম চাষীকে মাশরুম চাষের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন।
তিনি জানালেন, যে কোনও বেকার যুবক মাশরুম চাষের প্রশিক্ষণ নিতে চাইলে তিনি সাগ্রহে তাদের প্রশিক্ষণ দেবেন। এজন্য কোনও পারিশ্রমিক তিনি নেবেন না। আত্মনির্ভর ত্রিপুরা গড়ে তুলার অংশীদার হতে চান। নীলোৎপল সিনহা আরও জানালেন, তার এই উদ্যোগে সরাসরি সরকারি সহায়তা না পেলেও উদ্যানপালন ও ভূমিসংরক্ষণ দপ্তর থেকে ল্যাবরেটরি গড়ে তুলতে এবং স্পন উৎপাদনে সবরকম পরামর্শ পেয়েছি। তাছাড়াও রাজ্যের উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, সড়কপথে ও রেলপথে যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজতর হওয়ায় আসাম, পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা, ব্যাঙ্গালুরু ও মহারাষ্ট্রে উৎপাদিত মাশরুম বীজ পাঠাতে পারছেন। ভালো রোজগারের সুযোগ পেয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উদ্যোগে চালু হওয়া ডিজিটাল ইন্ডিয়া কর্মসূচির ভূয়সী প্রশংসা করে নীলোৎপলবাবু জানান, প্রযুক্তিগত সুবিধার দৌলতে তিনি অনলাইনের মাধ্যমে মাশরুম স্পন বিক্রি করতে পারছেন। এতে তার ব্যবসার প্রসার ঘটেছে। মাশরুম সুস্বাদু, পুষ্টিগুণও রয়েছে অনেক। বাজারে মাশরুমের চাহিদা তাই দিন দিন বাড়ছে। স্বনির্ভরতার জন্য মাশরুম চাষকে অনেকেই বেছে নিচ্ছেন। স্বনির্ভরতার অন্যতম ক্ষেত্র হতে পারে মাশরুম চাষ।