।। বিদ্যামোহন জমাতিয়া ।। স্বাধীনতার পর থেকেই দেশে অসম বিকাশের ফলে সর্বত্র উন্নয়নের ছোঁয়া গিয়ে পৌঁছায়নি। ফলস্বরূপ দেশের বিভিন্ন রাজ্যের প্রান্তিক জনপদগুলি ছিলো অবহেলিত। ২০১৫ সালে দেশের সার্বিক বিকাশের লক্ষ্যে বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার নীতি আয়োগ গঠন করে।
কেন্দ্রীয় সরকারের উন্নয়নের দৃষ্টিভঙ্গি ছিলো সবকা সাথ সবকা বিকাশ। এই লক্ষ্যেই দেশের প্রান্তিক এলাকার জনগণের কাছে উন্নয়নের সুফল পৌঁছে দিতে কেন্দ্রীয় সরকার কাজ করছে। নীতি আয়োগের পরামর্শে কেন্দ্রীয় সরকার ২০১৮ সালে দেশের ১১৭টি জেলাকে অ্যাসপিরেশনাল ডিস্ট্রিক্ট হিসেবে ঘোষণা করে।
পিছিয়ে পড়া এ সমস্ত জেলার দ্রুত উন্নয়নের লক্ষ্যেই অ্যাসপিরেশনাল ডিস্ট্রিক্ট ঘোষণা করা হয়। ২০১৮ সালে রাজ্যে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসে সবকা সাথ সবকা বিকাশের দিশায় এই রাজ্যের পিছিয়ে থাকা ১২টি ব্লককে অ্যাসপিরেশনাল ব্লক হিসেবে ঘোষণা করে। রাজ্যের পিছিয়ে পড়া ১২টি ব্লকের উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করতেই সরকারের এই পদক্ষেপ। এই ১২টি অ্যাসপিরেশনাল ব্লকের মধ্যে রাজ্যের উত্তর ত্রিপুরা জেলার কাঞ্চনপুর মহকুমার দশদা ব্লক অন্যতম।
কাঞ্চনপুর মহকুমা সদর থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত দশদা ব্লক। রাজ্যের প্রত্যন্ত অঞ্চলের অ্যাসপিরেশনাল ব্লক হিসেবে এটি পরিচিত। চারিদিকে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও সুন্দর বনে ঘেরা এই ব্লকটি। জাতি-জনজাতি উভয় অংশের লোকেরা এই ব্লকের স্থায়ী বাসিন্দা। বর্তমানে দশদা ব্লক ২০টি এডিসি ভিলেজ কমিটি নিয়ে গঠিত। এই ব্লকে মোট ১৪,৪৫৬টি পরিবার রয়েছে।
মোট জনসংখ্যা ৬১ হাজার ৩২৬ জন। এরমধ্যে তপশিলী জনজাতি জনসংখ্যা ৪৩,২৬১ জন, তপশিলী জাতি ৫,৬৭০ জন, ওবিসি ৯,৬৮৩ জন, ধর্মীয় সংখ্যালঘু ৪০ জন এবং অন্যান্য ২,৬৭২ জন। রাজ্যের পিছিয়ে পড়া দশদা ব্লকে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের গৃহীত বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের সুযোগ দ্রুত পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। অ্যাসপিরেশনাল ব্লকগুলির উন্নয়নে রাজ্য সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে।
কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির পাশাপাশি ব্লকের পরিকাঠামো উন্নয়নেও বিভিন্ন দপ্তরের সমন্বয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে এমজিএন রেগা প্রকল্পের মাধ্যমে দশদা ব্লকে ৯ লক্ষ ৭১ হাজার ৩৫টি শ্রমদিবস সৃষ্টি করে সংশ্লিষ্ট এলাকায় রাস্তা তৈরি, জমি সমতলকরণ, জলসেচের চ্যানেল, প্ল্যান্টেশন ইত্যাদি উন্নয়নমূলক কাজ করা হয়েছে। গড় ৯১৩৬ শতাংশ শ্রমদিবস সৃষ্টি করা হয়েছে। এতে ব্যয় হয়েছে ১৭ কোটি ৯৩ লক্ষ ৪৫ হাজার টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে এমজিএন রেগায় দশদা ব্লকে এখন পর্যন্ত ৬৩ হাজার ৮৫৮টি শ্রমদিবসের কাজ করা হয়েছে।
পঞ্চায়েত উন্নয়ন তহবিলে গত ২০২০-২১ অর্থবছরে দশদা ব্লক পেয়েছে ৯৩ লক্ষ ৯১ হাজার ৫৮২ টাকা। এরমধ্যে ৭১ লক্ষ ৫৫ হাজার ২৫১ টাকা ব্যয় করে এই এলাকায় পানীয় জলের উৎস সংস্কার সহ বিভিন্ন কাজ করা হয়েছে। পঞ্চদশ অর্থ কমিশন থেকে দশদা ব্লক গত ২০২০-২১ অর্থবছরে পেয়েছে মোট ২ কোটি ৯৪ লক্ষ ১০৯৪ টাকা। সেই অর্থে ব্লক এলাকার কৃষিকাজের জন্য জলসেচের সুবিধার্থে এল আই সংস্কার সহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ করা হচ্ছে।
পানীয় জল সরবরাহ সম্প্রসারণের লক্ষ্যে দশদা ব্লক এলাকায় দ্রুতগতিতে কাজ চলছে। অটল জলধারা মিশনের মাধ্যমে এবছর এখন পর্যন্ত ৫,৫৪৪টি পরিবারকে পরিশ্রুত পানীয় জলের সংযোগ বিনামূল্যে দেওয়া হয়েছে। ব্লকে পানীয় জলের উৎস রয়েছে ৪০টি, ডিপ টিউবওয়েল ৮টি, স্মলবোর ডিপটিউবওয়েল, আয়রন রিম্যুভাল প্ল্যান্ট রয়েছে ১১টি। এখন পর্যন্ত এই ব্লকে ২১৯.২০ কিমি পাইপ লাইনে জল সংযোগ দেওয়া হয়েছে।
এই ব্লকে বিদ্যুৎ উদ্যোগে বিদ্যুৎ সম্প্রসারণের জন্যও কাজ করা হচ্ছে। দপ্তরের সৌভাগ্য যোজনায় এখন পর্যন্ত এই ব্লক এলাকার ২,৬৯০টি পরিবারকে বিনামূল্যে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়েছে। দশদা ব্লকে ২০২২ সালের মধ্যে কৃষকদের আয় দ্বিগুণ করার লক্ষ্যে রাজ্য সরকার কাজ করছে। প্রধানমন্ত্রী কিষাণ সম্মাননিধি যোজনা প্রধানমন্ত্রী ফসল বীমা যোজনার মতো কেন্দ্রীয় প্রকল্পগুলির সুযোগ ব্লকের কৃষকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
এখন পর্যন্ত ব্লকে পি এম কিষাণ যোজনায় ৫,২৭৫ জন কৃষক এবং প্রধানমন্ত্রী ফসল বীমা যোজনায় ৪,৫৫১ জন কৃষক উপকৃত হয়েছেন। দশদা ব্লকের ১টি সরকারি ডিগ্রি কলেজ, ১টি আইটিআই, ৪টি হায়ার সেকেন্ডারি স্কুল, ১০টি হাই স্কুল, এস বি স্কুল ৩৯টি, জে বি স্কুল ৪১টি রয়েছে। দশদা ব্লক প্রশাসনের উদ্যোগে সম্প্রতি ট্রান্সফরমেশন অব অ্যাসপিরেশনাল ব্লক প্রোগ্রামের প্রজেক্ট প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে।
সেই কর্মসূচির মধ্যে এলাকার ৩টি স্কুলের প্লে গ্রাউন্ড উন্নয়ন, দশদা পি এস পি-কে সি এইচ সি-তে রূপান্তকরণ, পৃথক আই সি ডি এস প্রজেক্ট স্থাপন ইত্যাদি উন্নয়নমূলক কাজের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সবকা সাথ সবকা বিকাশের লক্ষ্যে অ্যাসপিরেশনাল ব্লক দশদা এখন বিকাশের পথে হাঁটছে।