Forestry : বনায়নে রাজ্যের মানুষকে যুক্ত করার প্রতীক স্মৃতিবন

।। মানিক মালাকার।। স্মৃতির পাতায় আজো জেগে রয়েছে সেদিন। ৪ জুলাই, ২০২০। আষাঢ় মাস। মাঝে মাঝে বৃষ্টি ঝড়ছিল। গাছের পাতায় পাতায় বৃষ্টির মুখরিত শব্দে প্রাণ চঞ্চলা হয়ে উঠেছিল জনজাতি অধ্যুষিত বুরাখা গ্রাম। আগরতলা শহর থেকে মাত্র ২০ কিমি দুরে মান্দাই ব্লকের বুরাখা। তেমন কোন উল্লেখযোগ্য পরিচিত জনপদ নয় বটে।

কিন্তু সেদিনের পর থেকেই মান্দাই-এর বুরাখা স্মৃতিপটে লিখে দিল এক নতুন অভিধা ‘স্মৃতিবন’ ৪ জুলাই, ২০২০ সালে এমনই এক বর্ষামুখর দিনে মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব কুমার দেব চারা গাছ লাগিয়ে সূচনা করেছিলেন ‘স্মৃতিবন’ এর। জুলাই মাসে বনমহোৎসব, বৃক্ষরোপন, গাছ লাগানোর বার্তা – এসব নতুন কিছু বিষয় নয়। বছরের পর বছর জুলাই মাস জুড়ে বৃক্ষরোপন উৎসব সাড়ম্বরে পালিত হয়ে আসছে। কিন্তু হঠাৎ করে কি এই ‘স্মৃতিবন’, যা সকলের নজরে উঠে আসে। বনের সঙ্গে আবার কি করে যুক্ত হলো ‘স্মৃতি’ শব্দটি ? আর কেনই বা স্মৃতিবন ? এ প্রশ্ন আমার মতো সকলেরই। আবার এসেছে আষাঢ়। ক্যালেন্ডারে জুলাই মাস। স্মৃতিপটে জেগে উঠল সেই স্মৃতি বন।

গত বছর থেকেই রাজ্যে অভিনব এক ভাবনায় শুরু হয়েছিল স্মৃতি বন প্রকল্পের। রাজ্যের বন দপ্তর ৮ জায়গাতেই ‘স্মৃতিবন’ গড়ে তোলার পরিকলল্পনা নেয়। উদ্দেশ্য হচ্ছে বনের সাথে মানুষকে যুক্ত করা। সেই ভাবনায় এসেছে এক দারুন পরিকল্পনা-‘স্মৃতিবন’। পূর্বপুরুষদের স্মৃতিকে ধরে রাখার এক অভিনব পরিকল্পনা হল এই ‘স্মৃতিবন’। এমন একটি বনাঞ্চল যেখানে আমরা পূর্বপুরুষ বা প্রিয়জনদের স্মৃতিচারণ করতে পারি।

তাদের উদ্দেশ্যে একটি করে গাছ লাগিয়ে একদিকে যেমন প্রিয়জনদের স্মরণীয় করে রাখা অন্যদিকে বৃক্ষ রোপনের মাধম্যে প্রাকৃতিক ভারসাম্যকে রক্ষা করা। সবুজে সবুজে আমাদের রাজ্যকে ভরিয়ে তোলা। বৃক্ষরোপনের মাধ্যমে গ্রাম-শহরকে সবুজে সাজানোর লক্ষ্য নিয়েই বনদপ্তর রাজ্যের প্রত্যেক ফরেষ্ট সাব-ডিভিশনে একটি করে ‘স্মৃতিবন’ চালু করার পরিকল্পনা নিয়েছে। বন দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, রাজ্যের কুমারঘাট, ধর্মনগর, সাব্রুম, মান্দাই, মনু, তেলিয়ামুড়া, খোয়াই, উদয়পুর এই ৮টি স্থানে ইতিমধ্যেই ১টি করে ‘স্মৃতিবন’ চালু করা হয়েছে।

এই স্মৃতিবনগুলোতে গিয়ে মানুষ তার প্রিয়জনদের স্মরণে তার পছন্দমত গাছ লাগাতে পারছেন। মানুষ যুক্ত হচ্ছেন এই প্রকল্পে৷ সাড়াও মিলছে নাগরিক সমাজের কাছ থেকে। শুধু রাজ্যে বসবাসকারী নাগরিকরাই নন স্মৃতিবনে বহিরাজ্যের নাগরিকগণও তাদের পূর্বপুরুষদের স্মৃতিতে বৃক্ষরোপন করতে পারেন। এক্ষেত্রে অনলাইনের সুযোগ রয়েছে। প্রযুক্তির যুগে এ এক নয়া কৌশল। সেটাই এর অভিনবত্বের দাবী রাখে।

মজার বিষয় হলো, এই স্মৃতিবনে বৃক্ষরোপনের সাথে সাথে রোপনকারী ব্যক্তির পূর্বপুরুষের নামে সাইনবোর্ড লাগানোর ব্যবস্থা রয়েছে। লাগানো গাছটি সম্পর্কে যাবতীয় তথ্য বিস্তারিত জানতে স্মার্ট ফোনে স্ক্যানিং কোড ব্যবহার করা যাবে। আসল কথা হচ্ছে প্রযুক্তি,কৌশল এবং অভিনবত্বকে কাজে লাগিয়ে গাছ লাগানোর এক নয়া পরিকল্পনাই হলো- ‘স্মৃতি বন’। আদিমকাল থেকেই মানুষ প্রকৃতিকে আরাধনা করে আসছে। বৃক্ষ, জল, মাটি ও বায়ু মানুষের কাছে আরাধ্য হিসাবে বিবেচিত হয়ে আসছে।

এটাই আমাদের ভারতীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য। গাছ আমাদের পরম বন্ধু। এর নির্বিচার ধুংসের ফলে আজ আমাদের কী অবস্থা তা সকলেই টের পাচ্ছি। গ্লোবাল ওয়ার্মিং আজ গোটা বিশ্বেই কাছেই মারাত্মক উদ্বেগের বিষয়। এই অবস্থায় আমাদের রাজ্যেও আরো আরো প্রয়োজন ব্যাপক সবুজ বনায়নের। রাজ্য সরকার ক্ষমতায় এসেই সবুজ ত্রিপুরা গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন।

সেই লক্ষ্যেকে সামনে রেখেই শুরু হল নতুন নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ ও তার বাস্তবায়ন। শুধু স্মৃতি বনই নয় জাতীয় সড়কের পাশে এক মিনিটে সাড়ে ছ’হাজার গাছ লাগানোর কর্মসূচি ইতিমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে। রাজধানী আগরতলাকে সবুজায়ন করার প্রয়াস নেওয়া হয়েছে। রাজ্য সরকার রাস্তার দুপাশে ফুল ও ফলের গাছ লাগাবার একটি নতুন প্রকল্প চালু করেছে। এর মাধ্যমে মানুষকে যুক্ত করে একদিকে যেমন আয় বৃদ্ধির প্রচেষ্টা নেওয়া হয়েছে তেমনি রাজাকে ফুলে-ফলে সাজানোরও এক নতুন প্রয়াস নেওয়া হয়েছে।

গত তিন বছরে বনসৃজন ও পরিবেশ রক্ষা কর্মসূচির অঙ্গ হিসেবে ১৪, ১৫২.৭১ হেক্টর এলাকা জুড়ে বৃক্ষরোপন করা হয়েছে। রাজ্যে রাস্তার পাশে ১,০৪৪৯ কিলোমিটার ও নদীর তীরে ৯১২.৫ কিলোমিটারে বৃক্ষরোপণ করা হয়েছে। বন সুরক্ষার লক্ষ্যে ৬৭৪.২৫ হেক্টর জমি গাঁজাচাষ মুক্ত করে ৬৪৫.০৫ হেক্টর জমিতে বাশ চাষ করা হচ্ছে। প্রকৃতি, বন, জীবন এবং সভ্যতা একে অপরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। প্রকৃতি এবং বনভূমি ছাড়া আমাদের জীবন কল্পনাও করতে পারিনা।

জীবন ও সভ্যতার অস্তিত্ব এবং অগ্রগতিতে বনভূমির প্রয়োজনীয়তা ও প্রাসঙ্গিকতা সার্বজনীনভাবে গ্রহণযোগ্য। শুধু গাছ লাগালেই হবে না, সেই গাছকে রক্ষা করার দায়িত্ব নিতে হবে এলাকাবাসীসহ সংশ্লিষ্ট জনগণকেও গাছ লাগানোর পাশাপাশি গাছ বাঁচানোই হোক এই সময়ের শ্লোগান- রাজ্যবাসীর কাছে সেই বার্তাই মুখ্যমন্ত্রীর। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার পাশাপাশি গাছের অর্থনৈতিক গুরুত্বও রয়েছে। শাল, সেগুন, মেহেগনি এগুলি থেকে ভাল কাঠ পাওয়া যায়।

তেমনি অর্জুন, নিম, হরিতকী ঔষধী বৃক্ষ হিসাবেও গুরুত্বপূর্ণ। রাজ্যকে অর্থনৈতিক দিক দিয়ে সমৃদ্ধ করতে গেলে এবং দূষণমুক্ত রাজ্য গড়ে তুলতে গেলে গাছ লাগানো আবশ্যক। পর্যটনের দিক থেকেও সবুজ প্রকৃতির গুরুত্ব রয়েছে। রাজ্যের ইকো ট্যুরিজম যে কোন পর্যটককেই আকর্ষণ করে। অদূর ভবিষ্যতে এক একটি স্মৃতিবনও পর্যটন কেন্দ্র হিসাবে গড়ে উঠতে পারে।

রাজ্যের মানুষের আয়ের উৎস হতে পারে, সেই ধারণাও অমূলক নয়। আসলে অগ্রগতির মূল্য লক্ষ্য হচ্ছে সঠিক দিশা ও উপযুক্ত পরিকল্পনা। সেই পরিকল্পনার সফল বাস্তবায়নের একটি জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত স্মৃতিবন।

আমাদের সকলের প্রিয়জনদের স্মৃতিতে, উৎসবে, জন্মদিনে আমরা সবাই যদি একটি করে গাছ লাগাই তবে একথা হলফ করেই বলা যায় সবুজে সবুজ হয়ে উঠবে আমাদের প্রিয় ত্রিপুরা। সবুজ ত্রিপুরায় আমরা আমাদের ভাবী প্রজন্মকে উপহার দেবো দূষণমুক্ত নির্মল পরিবেশ।

 

You May Also Like

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চ্যাট খুলুন
1
আমাদের হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠান
হেলো, 👋
natun.in আপনাকে কিভাবে সহায়তা করতে পারে?