গো-পালনে স্বনির্ভর উত্তর লক্ষ্মীলুঙ্গার কাজল রায়

৷৷ সুদীপ দাস ৷৷ আগরতলা, ৬ মে।। বামুটিয়া ব্লক অফিস ও হরেন্দ্রনগর চা বাগানের মধ্য দিয়ে যে রাস্তা উত্তরদিকে চলে গেছে তার শেষ গন্তব্য বামুটিয়া বাজার। বর্ধিষ্ণু এক জনপদ এই বামুটিয়া। বামুটিয়া যাওয়ার আগেই তেবারিয়া বাস স্টপেজে নামলে চোখে পড়বে পশ্চিম প্রান্তের টিলা পর্যন্ত ঢালু জমি ক্রমশ নীচে নেমে গেছে। সেখানে সারিবদ্ধ চা গাছ। চা বাগানের দুটি পাতা একটি কুঁড়ির গাছগুলি নয়ন ভোলানো এক সবুজের আস্তরণ তৈরি করে রেখেছে। লক্ষ্মীলুঙ্গা কৃত্রিম গো প্রজনন উপকেন্দ্রের উত্তর পাশের রাস্তা ধরে প্রাণীসম্পদ বিকাশ দপ্তরের আধিকারিক তপন দেববর্মার সাথে যাচ্ছিলাম উত্তর লক্ষ্মীলুঙ্গা গ্রাম পঞ্চায়েতের ২ নং ওয়ার্ডে। যেতে যেতেই প্রাণীসম্পদ বিকাশ দপ্তরের আধিকারিকের কাছ থেকে শুনছিলাম কাজল রায়ের স্বনির্ভর হওয়ার কাহিনী।

উত্তর লক্ষ্মীলুঙ্গা পঞ্চায়েতের ২ নং ওয়ার্ডের কাজল রায় এক গ্রামীণ গৃহবধূ। স্বামী অর্জুন রায় পেশায় রাজমিস্ত্রী। তাদের দুই সন্তান। মেয়ে দশম শ্রেণীতে ও ছেলে নবম শ্রেণীতে পাঠরত। দু’জনেই তেবারিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী। স্বামীর একার রোজগারে সংসার চালানো ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ছিলো। সংসারের হাল ধরতে নিজেই উদ্যোগী হলেন গৃহবধূ কাজল রায়। গাভী পালন করে স্বনির্ভরতার এক নতুন স্বপ্ন দেখলেন তিনি৷ পঞ্চায়েতের মাধ্যমে যোগাযোগ করলেন প্রাণীসম্পদ বিকাশ দপ্তরের সাথে। সুযোগও পেয়ে গেলেন। প্রাণীসম্পদ বিকাশ দপ্তরে মাইক্রো ডেয়ারি প্রকল্পে ত্রিপুরা গ্রামীণ ব্যাঙ্কের দুর্গাবাড়ি শাখা থেকে উন্নত প্রজাতির গাভী পালনে ঋণ পেলেন ১ লক্ষ ৬০ হাজার টাকা। ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তার ঋণ মঞ্জুর হয়।

প্রকল্পের নিয়ম অনুসারে গাভী পালনের জন্য ২০ হাজার টাকা দিয়ে গো গৃহ তৈরি করলেন এবং প্রাণী চিকিৎসকের পরামর্শে সেখানে দুটি বৈদ্যুতিক পাখা ও বৈদ্যুতিক আলোর ব্যবস্থা করলেন। ঋণের অবশিষ্ট টাকায় বাছুর সহ একটি উন্নত প্রজাতির দুগ্ধবতী গাভী ক্রয় করলেন। প্রাণীসম্পদ বিকাশ দপ্তরের ব্যবস্থাপনায় এই উন্নত প্রজাতির গাভী এলো বিহার থেকে। ২০২০ সালের মার্চ মাসে বিহার থেকে আর কে নগর ক্যাটেল ফার্মে গাভী আসার পর কাজল রায় সেখান থেকে গাভী সহ বাছুরটি তার বাড়িতে নিয়ে এলেন। এই ধরনের উন্নত প্রজাতির গাভীর প্রয়োজন পুষ্টিকর খাবার ও যত্ন। পরম মমতায় গ্রামীণ গৃহবধূ কাজল রায় গাভী ও বাছুরের যত্ন নিতে শুরু করলেন। প্রতিদিন গাভীকে স্নান করানো এবং পুষ্টিকর খাবার খড় ও সবুজ ঘাস দেওয়া হতো। এজন্য গড়ে প্রতিদিন ১৫০ টাকা ব্যয় হতো। মাসে খরচ হতো ৪,৫০০ টাকা। গাভীর প্রয়োজনীয় টিকা ও অন্যান্য ওষুধ প্রাণীসম্পদ বিকাশ দপ্তরের স্থানীয় কৃত্রিম গো প্রজনন উপকেন্দ্র থেকেই দেওয়া হতো৷

নিজের বাড়িতে গাভী নিয়ে আসার পর দু’তিন মাস পর থেকেই কাজল দেবীর স্বনির্ভরতার স্বপ্ন সফল হতে শুরু করলো। উন্নত প্রজাতির এই গাভী সকালে ৭ লিটার ও বিকালে ৫ লিটার করে প্রতিদিন দিতে শুরু করে। প্রতি লিটার দুধ বিক্রি করতে শুরু করলেন ৫০ টাকা করে। দুধ বাজারজাত করতেও কোনও অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়নি। স্থানীয় বাজার ছাড়াও আগরতলা থেকে কাজল দেবীর বাড়িতে এসে দুধ নিয়ে যান অনেকেই। এতে তার দৈনিক ৬০০ টাকা করে মাসে ১৮ হাজার টাকা রোজগার হচ্ছে। প্রতি মাসে খরচ ৪,৫০০ টাকা ও ব্যাঙ্ক ঋণের কিস্তি ৩, ১১২ টাকা মিলিয়ে তার মাসে ব্যয় ৭,৬১২ টাকা। অর্থাৎ একটি গাভী পালন করেই কাজল দেবী মাসে প্রায় ১০,৩৪৪ টাকা রোজগার করতে শুরু করলেন। এই সাফল্যে উৎসাহী হয়ে ১ বছরের মধ্যেই কাজল দেবী ব্যক্তিগতভাবে উদ্যোগী হয়ে আরও একটি দুগ্ধবতী গাভী ক্রয় করেন৷ এই গাভী থেকেও তার আরও ৮ হাজার টাকা মাসে রোজগার হচ্ছে। এই টাকায় কাজল দেবীর সংসারে এখন অনেকটাই সুদিন ফিরেছে। ছেলেমেয়েদের জন্য গৃহ শিক্ষক রেখেছেন এবং ছেলেকে একটি বাইসাইকেলও কিনে দিয়েছেন। নিজের ঘরেও এখন বৈদ্যুতিক পাখা ঘুরছে। জ্বলছে বৈদ্যুতিক আলোও। এসব কিছুই সম্ভব হয়েছে গাভী পালনের রোজগারের মধ্য দিয়েই। প্রাণীসম্পদ বিকাশ দপ্তরের আধিকারিক তপন দেববর্মা জানালেন, কাজল দেবী উন্নত প্রথায় গাভী পালনের দিকগুলি খুব সহজেই রপ্ত করেছেন। তিনি নিজেও উৎসাহী ছিলেন। এতেই এই সাফল্য এসেছে। কাজল দেবীর এই সাফল্যের পিছনে প্রাণীসম্পদ বিকাশ দপ্তরের যে ভূমিকা রয়েছে তা তিনি অকপটে স্বীকার করেন। মাইক্রো ডেয়ারি প্রকল্পে ঋণ মঞ্জুর থেকে শুরু করে বহির্রাজ্য থেকে উন্নত গাভী এনে দেওয়ার পিছনে প্রাণীসম্পদ বিকাশ দপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিলো। তাছাড়াও প্রাণী সহায়ক তপন দেববর্মা নিয়মিত বাড়িতে এসে গাভী পালনে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়েছেন। যা খুবই কাজে দিয়েছে কাজল দেবীর। গো পালনের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতির জীবনযাত্রায় যে একটা নতুন দিশা আনা যায় তার অন্যতম নিদর্শন উত্তর লক্ষ্মীলুঙ্গার গৃহবধূ কাজল রায়।

You May Also Like

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চ্যাট খুলুন
1
আমাদের হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠান
হেলো, 👋
natun.in আপনাকে কিভাবে সহায়তা করতে পারে?