স্টাফ রিপোর্টার, আগরতলা, ২৬ ফেব্রুয়ারী।।বইমেলা ত্রিপুরাবাসীর জন্য নতুন বিষয় নয়৷ বইমেলার স্বার্থকতা আসবে সমাজে বইমেলার প্রভাব কতটুকু পড়েছে তার মূল্যায়নে৷ আজ বিকালে হাঁপানিয়া আন্তর্জাতিক মেলা প্রাঙ্গণে ১৪ দিনব্যাপী ৩৯তম আগরতলা বইমেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করে মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব কুমার দেব একথা বলেন৷
তিনি বলেন, এখন ইন্টারনেট, ই-বুকসের যুগ৷ বলতে গেলে আমাদের হাতের মুঠোর মধ্যেই রয়েছে পুরো দুনিয়া৷ এরপরও বইয়ের মূল্যায়ন এবং তার যে স্বার্থকতা কোনও অংশে কম নয়৷ কোভিড-১৯ যখন গোটা দুনিয়াকে নাড়িয়ে দিয়েছে সে সময়ও বই তার স্বকীয়তা বজায় রেখে নিজের প্রয়োজনীয়তা আরও একবার বুঝিয়ে দিয়েছে৷
রোগীদের মধ্যে মানসিক দৃঢ়তা বাড়ানোর জন্য কোভিড কেয়ার সেন্টারগুলিতে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে স্বামী বিবেকানন্দকে নিয়ে লেখা বিভিন্ন বই বিতরণ করা হয়েছে৷ মুখ্যমন্ত্রী বলেন, সাহিত্য, কলা, সংস্ক’তির সঙ্গে এ রাজ্যের সম্পর্ক সেই রাজন্য যুগ থেকে৷ বর্তমান সরকার ক্ষমতাসীন হবার পর থেকে এই বিষয়গুলি ক্রমেই প্রসারিত হচ্ছে৷ এই বিষয়ে নেওয়া হয়েছে নানা পদক্ষেপ৷
এগুলির মধ্যে রয়েছে বীরচন্দ্র স্টেট সেন্ট্রাল লাইবেরীর আধুনিকীকরণ, জেলা লাইবেরীগুলির আধুনিকীকরণ, ১৬৪টি পঞ্চায়েত লাইবেরীর ব্যবস্থা করা, ইন্টারনেটের সংযোগ দেওয়া, ভিডিও কনফারেন্সের ব্যবস্থা করা ইত্যাদি৷ এরজন্য রাজ্য সরকারের বাজেট থেকে অতিরিক্ত অর্থের ব্যবস্থা করা হয়েছে৷
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ত্রিপুরা যে কলা, সংস্ক’তির জন্য সুুদীর্ঘকাল থেকে সমৃদ্ধ তার প্রমাণ পাওয়া যায় থাঙ্গা দার্লং, বেনীচন্দ্র জমাতিয়া, সত্যরাম রিয়াং-র পদ্মশ্রী পুরস্কার পাবার মধ্য দিয়ে৷ মুখ্যমন্ত্রী বলেন, বইমেলা আমাদের সমাজ ব্যবস্থা, আমাদের নতুন প্রজন্মের জন্য নতুন উপহার নিয়ে এসেছে৷ বই মেলা মানে শুধুমাত্র বই কেনা বা পড়া নয়, বড় বিষয় হচ্ছে মানসিকতা তৈরি করা৷ ইতিবাচক উন্নয়নের, স্বনির্ভরের মানসিকতা এই মেলার মাধ্যমে আমাদের মধ্যে আরও বেশি করে গড়ে উঠবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন৷
https://www.facebook.com/watch/?v=914047046065289
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, করোনা পরিস্থিতির মধ্যেও রাজ্যের বর্তমান সরকার বিভিন্ন সেক্টারে সঠিক দিশায় কাজ করে গেছে৷ মুখ্যমন্ত্রী বলেন, এখানে কোন কিছুর জন্য আন্দোলন করতে হয়না৷ কোভিড পরিস্থিতির জন্য অনেক রাজ্যে যেখানে কর্মচারিদের বেতন ত্রিশ শতাংশ পর্যন্ত কাটছাট করা হয়েছে সেখানে ত্রিপুরার কর্মচারিদের বেতন এক টাকাও হাস করা হয়নি৷
উল্টো বিনা ডেপুটেশনে কর্মচারিদের জন্য তিন শতাংশ ডি এ ঘোষণা করা হয়েছে৷ মুখ্যমন্ত্রী বলেন, শিক্ষা হল সমাজ ব্যবস্থাকে সঠিক দিশায় নেবার মাপকাঠি৷ সেক্ষেত্রে এন সি ই আর টি’র সিলেবাস চালু ত্রিপুরার শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য ইতিহাস হয়ে থাকবে৷ যে পরিবার অন্ত্যোদয়ের সুুযোগ গ্রহণ করে থাকে তারাও আজ গর্ব অনুভব করে যে তার সন্তান এন সি ই আর টি’র সিলেবাসে অন্যদের সঙ্গে পড়াশুনা করবে৷
বইমেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করে উপমুখ্যমন্ত্রী যীষ্ণু দেববর্মা বলেন, বর্তমানে কোভিড পরিস্থিতিতে বইমেলার আয়োজন করা যাবে কিনা তা নিয়েই সংশয় ছিল৷ শেষ পর্যন্ত সবার আন্তরিক সহযোগিতায় অন্যান্য বছর থেকে আরও বড় পরিসরে বইমেলার আয়োজন করা হয়েছে৷ এবার বইমেলায় উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলো থেকে সাংস্ক’তিক দল তাদের সাংস্ক’তিক ঐতিহ্য আমাদের সামনে তুলে ধরবেন৷
তাই এবার শুধু বইমেলাই নয়, সাংস্কৃতিক মেলাও৷ রাজ্য সরকার চেষ্টা করছে বইমেলাকে আরও সমৃদ্ধ এবং আকর্ষণীয় করতে৷ উপমুখ্যমন্ত্রী বলেন, লেখা লেখি, সাহিত্য সৃষ্টির অভ্যাস ত্রিপুরায় সব সময়ই ছিল৷ দিনে দিনে তা আরও সমৃদ্ধ হচ্ছে৷ তিনি বলেন, এবার বইমেলার মূল ভাবনা বা থিম হলো, ’আমাদের ত্রিপুরা শ্রেষ্ঠ ত্রিপুরা’৷
উপমুখ্যমন্ত্রী বলেন, আমরা বিশ্বাস করি সবার সহযোগিতায় আমরা ত্রিপুরাকে শ্রেষ্ঠ বানাতে পারব৷ বইমেলার সঙ্গে যুক্ত সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি সবার প্রতি আহ্বান জানান, বই কিনুন, বই পড়ন, অন্যকেও বই পড়ান৷ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি রাজস্ব দপ্তরের মন্ত্রী নরেন্দ্র চন্দ্র দেববর্মা বলেন, বই ও মেলা, এই দুটি শব্দ আমাদের মনে অনুরণন সৃষ্টি করে৷ এই দিনটি আমাদের কাছে আনন্দের দিন৷
এই দিনটির জন্য আমরা অপেক্ষা করে থাকি৷ সারা বছরই অনেক নবীন, প্রবীণ লেখকের বই আমাদের রাজ্যে প্রকাশিত হয়৷ কিন্তু বইমেলার মে’ বই প্রকাশের আনন্দ আলাদা৷ তিনি বলেন, বাংলা ভাষায় যেসব সাহিত্য সৃষ্টি হচ্ছে তা আমরাও ভাগ করে নিচ্ছি৷ সাহিত্য সমাজের দর্পণ৷ সাহিত্য সমাজ পরিবর্তনেও মনন ও চিন্তার মাধ্যম৷ আমাদের দেশে বৃটিশ শাসনে দীনবন্ধ মিত্রের নীলদর্পণ নাটক স্বাধীনতার চেতনাকে উদ্বেলিত করেছিল৷
তিনি একজন সাধারণ পাঠক হিসেবে লেখকদের কাছে আহ্বান জানান আপনারা সৃজনশীল সাহিত্য সৃষ্টি করুন৷ সমাজকে উপহার দিন৷ এই সাহিত্য যেন আলোড়ন সৃষ্টি করে৷
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি শিক্ষামন্ত্রী রতনলাল নাথ বলেন, বইমেলা হলো মেধা ও মননের মেলা৷ তিনি বলেন, একটি কলম, একটি বই, একজন মানুষ সারা বিশ্বকে পরিবর্তন করে দিতে পারে৷ বই পাঠককে শুধু আনন্দই দেয়না, জীবন পরিবর্তনেও সাহায্য করে৷
https://www.facebook.com/bjpbiplab/videos/706394246719076/
প্রখ্যাত সাহিত্যিক সুুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বলেছেন, বই, সাহিত্য আমাদের কৃষ্টি ও সংস্কৃতিকে নতুনভাবে নির্মাণ করে৷শিক্ষামন্ত্রী স্বামী বিবেকানন্দের উদ্ধ’তি দিয়ে বলেন, স্বামীজি বলেছেন ইতিবাচক হও৷ প্রসঙ্গক্রমে তিনি বলেন, বর্তমানে পৃথিবীর প্রায় সব দেশ ভারতকে অনুসরণ করছে৷ কারণ ভারত স্বামী বিবেকানন্দের দেখানো পথে চলছে৷ শিক্ষামন্ত্রী বলেন, সুুস্থ চিন্তা, মেধা, মননের চর্চার জন্য বইমেলার গুরুত্ব অপরিসীম৷
গত তিন বছরে রাজ্যের সাহিত্য জগৎ আরও বেশি সমৃদ্ধ হয়েছে৷ তিনি আশা প্রকাশ করেন এক ত্রিপুরা শ্রেষ্ঠ ত্রিপুরার শ্লোগানকে আরও গতিশীল করতে বইমেলাও সহায়ক ভূমিকা নেবে৷ অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি আগরতলাস্থিত বাংলাদেশ হাই কমিশনের সহকারি হাই কমিশনার মহঃ যুবায়েদ হোসেন বাংলাদেশকেও বইমেলায় সংপ্রিক্ত করার জন্য ধন্যবাদ জানান৷
তিনি বইমেলার সাফল্য কামনা করেন৷ বইমেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ত্রিপুরা বিধানসভার উপাধ্যক্ষ বিশ্ববন্ধ সেন, বিধায়ক রামপ্রসাদ পাল, বিধায়ক মিমি মজমদার, তথ্য ও সংস্ক’তি দপ্তরের বিশেষ সচিব অভিষেক চন্দ্রা৷ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সবাইকে স্বাগত জানিয়ে বক্তব্য রাখেন তথ্য ও সংস্ক’তি দপ্তরের অধিকর্তা রতন বিশ্বাস৷ তিনি জানান, এবার বইমেলায় মোট ১৬৪টি স্টল রয়েছে৷
যারা উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সামিল হতে পারেননি তাদের জন্য এই অনুষ্ঠান ফেসবুকে সরাসরি প্রচার করা হয়েছে৷ বইমেলায় কোভিড-১৯ আচরনবিধি মেনে চলার জন্য তিনি সবার প্রতি আহ্বান জানান৷ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব কুমার দেব এবং অন্যান্য অতিথিগণ ৩৯তম আগরতলা বইমেলার মরনণিকা, তথ্য ও সংস্ক’তি দপ্তর থেকে প্রকাশিত গোমতী সাহিত্য পত্রিকা, রমা চক্রবর্তীর লেখা ’অনুভব’ গ্রন্থটির আনুষ্ঠানিক প্রকাশ করেন৷ পরিবেশিত হয় বইমেলার মূল ভাবনা ’আমাদের ত্রিপুরা শ্রেষ্ঠ ত্রিপুরার উপর ভিত্তি করে নৃত্যায়ন৷
বইমেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব কুমার দেব বাংলাদেশের থিম প্যাভিলিয়ান, তথ্য ও সংস্ক’তি দপ্তরের থিম প্যাভিলিয়ান এবং ফোটো গ্যালারীর উদ্বোধন করেন৷