৷৷ নীতা সরকার ৷৷
পুরাতন আগরতলা ব্লকের নন্দননগরের পালপাড়ার উৎসাহ হারিয়ে ফেলা মৃৎশিল্পীরা পুনরায় কর্ম উদ্দীপনায় জেগে উঠেছেন৷ এর পেছনে অবদান হচ্ছে কেন্দ্রীয় খাদি কমিশন ও ত্রিপুরা খাদিবোর্ডের৷ ২০১৭-১৮ অর্থবর্ষ থেকেই সারা দেশে মৃৎশিল্প ও মৃৎশিল্পীদের জীবনযাত্রার উন্নয়নে কর্মসূচি শুরু হয়েছিল৷ খাদি কমিশনের এই কর্মসূচির লক্ষ্য হল গ্রামীণ সভ্যতার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য বন্ধন মৃৎশিল্প ও শিল্পী উভয়কেই সুুরক্ষিত রাখা৷ এই শিল্পে আধুনিক প্রশিক্ষণের অভাব, প্রযুক্তি ব্যবহারের ঘাটতি, অন্যদিকে প্লাস্টিক ও স্টিলের সামগ্রীর ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়া, মাটির সামগ্রীর সামাজিক চাহিদা হাস পাওয়াতে এই শিল্প বিলুপ্তির পথে৷
তাই মৃৎশিল্পের সুুরক্ষার জন্য খাদি কমিশন ২০১৮-১৯ অর্থবর্ষে ত্রিপুরায় কর্মসূচি গ্রহণ করে৷ তখন রাজ্যের ২৪০ জন মৃৎশিল্পীকে প্রযুক্তি ব্যবহার করে আধুনিক পদ্ধতিতে মাটির সামগ্রী তৈরীর ১০ দিনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়৷ প্রশিক্ষণ শেষে শিল্পীদের মাটির সামগ্রী তৈরীর জন্য বৈদ্যুতিক চাকা ও আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়৷ প্রশিক্ষণে এই শিল্পকে প্রতিষ্ঠিত করার বিষয়েও উৎসাহিত করা হয়৷ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মৃৎশিল্পীদের মধ্যে ১০০ জন মৃৎশিল্পীই নন্দননগর পালপাড়ার বাসিন্দা৷ কালাপানিয়াছড়ার দুপার জুড়েই পালপাড়ার এই মৃৎশিল্পীদের বসবাস৷ মোট তিনটি পাড়ায় ২৫০টি মৃৎশিল্পী পরিবার বসবাস করেন৷
২০১৮-১৯ অর্থবর্ষে মৃৎশিল্পীদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচির সূত্র ধরেই পালপাড়ার মৃৎশিল্পীরা খাদি কমিশনের নজরে আসে৷ তাদের শিল্প নিপুনতার জন্যই ২০১৯-২০ অর্থবর্ষে পালপাড়ার মৃৎশিল্পীদের জীবন জীবিকা এবং মৃৎশিল্পের উন্নয়নের লক্ষ্যে খাদি কমিশন ’স্কীম অব ফাণ্ড ফর রিজেনারেশান অব ট্রেডিশন্যাল ইনডাস্ট্রিস’-এ পাইলট প্রকল্পে পালপাড়াকে ৫ বছরের জন্য অন্তর্ভক্ত করা হয়েছে৷ প্রকল্প অনুযায়ী এই পাড়ায় পুরো ৫ বছর কুমার স্বশক্তিকরণ কর্মসূচি আয়োজিত হবে৷ শিল্পীদের মাটির সামগ্রী তৈরীর বি’ানসম্মত ও আধুনিক প্রযুক্তি বিদ্যার প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে৷
মাটির উৎপাদিত সামগ্রী পোড়ানোর জন্য আধুনিক চুল্লিযুক্ত গৃহ নির্মাণ করে দেওয়া হবে৷ দেওয়া হবে মাটি মিশ্রণের যন্ত্রাদি৷ ৯০ শতাংশ ভর্তকীতে তাদের ঋণ দেওয়া হবে প্রধানমন্ত্রী রোজগার যোজনায়। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী জনধন যোজনা, সুুরক্ষাবীমা যোজনা, জীবনজ্যোতি বীমা যোজনা এবং অটল পেনশন যোজনার সুুবিধাগুলিও এই প্রকল্পে অন্তর্ভক্ত শিল্পীদের দেওয়া হবে৷ এককথায় এই স্কীমে এই পাড়ার মৃৎশিল্পীদের আগামী ৫ বছরে স্বরোজগারী ও সুুপ্রতিষ্ঠিত করার সঠিক দিশা দেখানো হবে৷ সেই সাথে রাজ্যের ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্পেরও বিকাশ ঘটবে৷ পালপাড়ার মৃৎশিল্পীদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার কাজও শেষ হয়েছে৷ পাঁচ বছরের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে পালপাড়া পাইলট প্রজেক্টের কাজ এগিয়ে চলছে৷ আগরতলার কেন্দ্রীয় খাদি কমিশনের আধিকারিক দেবাশিস রায় এই প্রকল্পের কাজ তদারকি করছেন৷ এখন পালপাড়ায় গেলেই দেখতে পাওয়া যাবে মৃৎশিল্পীগণ তাদের কাদা ও রঙ্মাখা হাতের জাদুস্পর্শে মাটির শিল্প সামগ্রী তৈরী করছেন৷
কেউ পূজার ঘট, প্রদীপ, কলসি, হাড়ি, তো কেউ চায়ের ভাঁড়, গ্লাস বাটি, মাটির গহনা আরো কত কী তৈরী করছেন৷ দেখে মনপ্রাণ জড়িয়ে যায়৷ যেন কুমোর পাড়ায় নব জাগরণের উৎসব লেগেছে৷ কুমোরের বৈদ্যুতিক চাকার সাথে তাদের জীবনজীবিকার উন্নয়নের ভাগ্যের চাকাও আজ ঘুরে দাঁড়িয়েছে৷ মৃৎশিল্পীরা এখন স্বরোজগারী হওয়ার স্বপ দেখছেন৷ পরিদর্শনকালে সেখানকার প্রতিষ্ঠিত মৃৎশিল্পী শ্রীনিবাস রুদ্রপালের সাথে কথোপকথনে জানা যায়, মাটির জিনিস তৈরীর ব্যবসা এই পাড়ার মানুষের প্রধান বংশ পরম্পরাগত জীবিকা৷ কিন্তু বর্তমানে প্লাস্টিকজাত সামগ্রী বাজার দখল করে নেওয়াতে মাটির জিনিসের চাহিদা কমে গেছে৷ তাই মৃৎশিল্পীরা আর্থিক কষ্টে ভুগছিলেন৷ অনেকেই এই পেশা ছেড়ে অন্যান্য পেশার দিকে ঝঁকে পড়ছিলেন৷
ঠিক সেই সময় খাদি কমিশন মৃৎশিল্পীদের পুনরায় এই কাজে ফিরে আসার জন্য উৎসাহিত করে এবং সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয়৷ সেই থেকে শিল্পীগণ আবার এই শিল্পের প্রতি উৎসাহিত হন৷ শ্রীনিবাস বাবু জানান, বৈদ্যুতিক চাকায় কম সময়ে অধিক সামগ্রী তৈরী করা যায়৷ কায়িকশ্রমও কম হয়৷ তিনি জানান, ভাল মাটির অভাবেও অনেক সময় চাহিদা অনুযায়ী ভাল জিনিস বানানো যায় না৷ তাই শ্রীনিবাসবাবু সহ পালপাড়ার মৃৎশিল্পীগণ ত্রিপুরা সরকার ও খাদি কমিশনের কাছে ভাল মাটি যোগান দেওয়ার বিষয়ে অনুরোধ জানান৷ সেই সাথে শ্রীনিবাসবাবু এবং পালপাড়ার বাসিন্দাগণ সকলেই মৃৎশিল্পের পুনঃ উন্নয়ন কর্মসূচির জন্য ত্রিপুরা সরকার এবং আগরতলা খাদি কমিশনকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান৷