কোথাও আঁকা নবদম্পতির দৃশ্য, তো কোথাও রয়েছে ঊনকোটির ছবি, লঙ্কামুড়ায় দেয়ালচিত্র

প্রসেনজিৎ চৌধুরী ৷৷ কোথাও আঁকা নবদম্পতির দৃশ্য, তো কোথাও রয়েছে ঊনকোটির ছবি৷ আবার কোথাওবা রয়েছে শিব গৌরী, কোথাও রয়েছে বাঘ ময়ূরের ছবি৷ আগরতলা শহরের অদূরে লঙ্কামুড়া গ্রাম পঞ্চায়েতের কপালী পাড়ার ৩০টি বাড়ির মাটির এবং পাকা ঘরের দেওয়াল যেন হয়ে উঠেছে এক একটি ক্যানভাস৷ সাত রঙের মিশেলে প্রতিটি চিত্রকর্মই হয়ে উঠেছে মায়াবী৷ অনন্য চিন্তাশক্তি ও শিল্পীর বৌদ্ধিক তুলির টানে গ্রাম ত্রিপুরার ঐতিহ্য দেরীতে হলেও ধীরে ধীরে প্রস্ফূটিত হয়ে ধরা দিচ্ছে৷ ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠান উপলক্ষ্যে বাড়ির উঠানে বিশালাকৃতি দৃষ্টিনন্দন আল্পনা আঁকাই হল এই অ’লের মানুষের প্রথাগত ঐতিহ্য৷ প্রতি বছরই তাদের এই চিত্রকর্মের ক্যামেরাবন্দী ছবির দেখা মিলছে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের পাতায় বা পর্দায়৷ এতদিন তাঁদের চিত্রকর্মের প্রয়োজনীয়তা শুধুই ছিল নিজেদের জন্য৷

এই চিত্রকর্মের বিকাশ তাদের যে জগৎজোড়া খ্যাতি এনে দিতে পারে, এই ধারণাটি তারা কোনও দিন কল্পনাও করেননি৷ কিন্তু পরিস্থিতি কিছুটা হলেও এবার পরিবর্তিত হয়েছে৷ যদিও এর শুরুটা হয়েছিল গতবছর পৌষ সংক্রান্তির সময়, সংস্কার ভারতীর ত্রিপুরা প্রান্তের কয়েকজন সদস্যের এই গ্রাম পরিদর্শনের পরই৷ গ্রামবাসীদের এই চিত্রকর্মের বিকাশের জন্য গত ১৮ নভেম্বর, ২০২০ থেকে শুরু করা হয় ফক এণ্ড ট্রাইবেল মুর্যাল প্রিন্টিং ওয়ার্কশপ৷ ১০ দিনের এই ওয়ার্কশপ আয়োজিত হয় ২৭ নভেম্বর পর্যন্ত৷ সংস্কার ভারতীর এই উদ্যোগে পাশে পেয়েছে কেন্দ্রীয় সংস্ক’তি মন্ত্রকের পূর্বাঞ্চল সাংস্ক’তি কেন্দ্র এবং ত্রিপুরা সরকারের তথ্য ও সংস্ক’তি দপ্তরকে৷ উভয় দপ্তরের আর্থিক সহায়তায় আয়োজিত এই কর্মশালায় অংশগ্রহণ করছে ৩০ জন স্থানীয় শিল্পী৷ যাদের প্রত্যেকেই গৃহবধূ৷

তাছাড়াও তাদের প্রশিক্ষণের জন্য ছিলেন ১০ জন প্রশিক্ষকও৷ প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত চলত কর্মশালা৷ প্রশিক্ষকরা মূলত তাদের চিত্রকর্মকে আরও দৃষ্টিনন্দন করতে কি কি পন্থা অবলম্বন করতে হবে সেই সম্পর্কে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়েছেন৷ এরফলে তাদের চিত্রকর্মের কলা কৌশলে কি কি পরিবর্তন এসেছে একথা জানাতে গিয়ে স্থানীয় এক চিত্রশিল্পী  শান্তি কপালী বলেন, তারা এমনিতে বাড়ির উঠানে অনেক সময়েই আল্পনা আঁকেন বিভিন্ন পরবে৷ এই শিল্প তাদের পূর্ব পুরুষদের কাছ থেকে শিখেছেন৷ আগে তারা এই কাজের জন্য প্রাক’তিকভাবে আহরিত বিভিন্ন রঙের ব্যবহার করতেন৷ কিন্তু যুগের পরিবর্তনের সাথে সাথে এখন ব্যবহার করা হচ্ছে কৃত্রিম রঙ৷ এধরণের কর্মশালা আয়োজনের জন্য তিনি রাজ্যসরকার ও সংস্কার ভারতীর প্রতিনিধিদের ধন্যবাদ জানান৷

তিনি আরও বলেন কর্মশালা আয়োজনের ফলে চিত্রকর্মে তারা যেমন উন্নত পদ্ধতি অবলম্বন করতে শিখেছে৷ তেমনি এই সময়কালে অনেক সংবাদমাধ্যম ও বিশিষ্ট ব্যাক্তির উপস্থিতি তাদের এই শিল্পকর্মকে রাজ্য তথা দেশ বিদেশের মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে সক্ষম হবে৷ সারা দেশে পরিচিতি বাড়বে রাজ্যের৷ কর্মশালার আয়োজনের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে সংস্কার ভারতীর সম্পাদক সুুমন ভ-াচার্য বলেন, মাটির দেওয়ালগুলোতে ত্রিপুরার লোকসংস্কৃতিকে তুলে ধরা হয়েছে৷ এখানকার মানুষের আল্পনা আঁকার যে ঐতিহ্য রয়েছে তা আরও বেশি মানুষের কাছে নিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যেই এই কর্মশালা৷ অংশগ্রহণকারী প্রশিক্ষণার্থীদের সকলকেই দৈনিক সাম্মনিকও দেওয়া হয়েছে, যাতে তারা একাজে উৎসাহিত হন৷ তিনি আরও বলেন গ্রামটি এ রাজ্যের বিমানবন্দরের অনেকটাই কাছে৷ এই গ্রামটির পরিকাঠামো আরেকটু উন্নতি করে গ্রামীণ পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা যায়৷ বিমানে আগরতলায় আসা বা ফিরে যাওয়ার আগে পর্যটকরা এই গ্রামটি ঘুরে যেতে পারেন৷

পর্যটকদের আগমনকে কেন্দ্র করে এই এলাকার মানুষের রোজগারের ব্যবস্থাও হতে পারে৷ তাতে গ্রামীণ শিল্পীগণ আরও উৎসাহিত হবেন৷
ভারতীয় উপমহাদেশের মিথিলা অ’লের মধুবনী চিত্রকর্মের পরিচিতি জগৎ জড়ে রয়েছে৷ রয়েছে ওই অঞ্চলের মানুষের শৈল্পিক নিপুনতার পরিচিতি, দেখিয়েছে রোজগারের উপায়, দিয়েছে পর্যটনের ঠিকানা৷ তেমনি আমাদের রাজ্য সরকারও রাজ্যের ঐতিহ্যবাহী শিল্পকলা ও সংস্কৃতির বিকাশের মাধ্যমে স্বনির্ভর রাজ্য গড়তে উদ্যোগ নিয়েছে৷ রাজ্যের পরিচিতিকে জগৎসভায় তুলে ধরতে রাজ্য সরকার সব সময়ই নতুন নতুন পরিকল্পনাকে ফলপ্রসূ করার বিষয়ে সচেতন৷ সাধারণের বিশ্বাস, এই উদ্যোগ রাজ্যের গ্রামীণ পর্যটনে মাইল ফলক হিসাবে পরিচিত হবে৷ যুক্ত হবে এরাজ্যের পর্যটনস্থলগুলোর ক্রম তালিকায়৷ সঙ্গে সঙ্গে বিকশিত হবে এই অঞ্চলের শিল্পীদের নিপুনতা ও শিল্পকর্ম৷

You May Also Like

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চ্যাট খুলুন
1
আমাদের হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠান
হেলো, 👋
natun.in আপনাকে কিভাবে সহায়তা করতে পারে?