স্টাফ রিপোর্টার, আগরতলা, ২৬ সেপ্টেম্বর।। একের পর এক আর্থিক প্রতারণার শিকার হচ্ছে এই পার্বতী ত্রিপুরার সহজ সরল মামুষগুলি। দশকের পর দশক পিছিয়ে থাকা এই রাজ্যের মানুষের ক্রয় ক্ষমতা যখন একটু একটু করে বৃদ্ধি পাচ্ছিল তখন চিটফান্ড সংস্থাগুলি রাজ্যে প্রতারণার জাল বিছিয়েছিল।শতাধিক সংস্থা সাম্রাজ্য বিস্তার করে এখানে। কয়েকটি ক্যালেন্ডার বছরের মধ্যেই রাজ্যবাসীর কষ্টার্জিত কোটি কোটি টাকা আমনত একত্রিত করে ফেলে।
লক্ষ লক্ষ এজেন্ট নিযুক্ত করে জনগণের কাছ থেকে আমানত সংগ্রহ করেছে। হঠাৎ একে একে ঝাপ বন্ধ হয়ে যায় সংস্থাগুলির। থানা- পুলিশ, কোর্ট-কাছারি, সিট-সিআইডি থেকে শুরু করে সিবিআই। রাজপথ থেকে শুরু করে বিধানসভা। পার্টি অফিস থেকে রাষ্ট্রপতি ভবন। গ্রামের উঠানসভা থেকে নির্বাচনের সমাবেশ। সব জায়গায় আওয়াজ উঠে লুটেরাদের ছাড়া হবেনা, আমানত ফেরত পাবেন ক্ষতিগ্রস্ত মানুষগুলি। কোথায় কি। সবই ঠুসঠাস্। এসব রাজ্যের মানুষের জানা ঘটনা। অজানা বিষয় হল আদৌও কি লুট হওয়া টাকা ফেরত মিলবে। এর নিশ্চয়তা কে দেবে। এই প্রশ্ন আজও তাড়া করে বেরায়।
এরাজ্যের মানুষ অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ। কিন্তু তারপরও কেন এরাজ্যের একাংশ মানুষ বার বার প্রতারিত হচ্ছেন। লোভের বশে কেন নিজেদের প্রতারকদের সামনে আত্মসমর্পণ করছেন। অবাক করার বিষয় হচ্ছে রাজ্যের এই মানুষগুলির সাথে প্রতারণা করে চলেছে বহিরাগতরাই।
প্রায় সাত মাস হল করোনা থাবা বসাল গোটা বিশ্বে। এর প্রভাব আছড়ে পড়েছে এই সবুজে ঘেরা পার্বতী ত্রিপুরাতেও। এই রাজ্যের আর্থিক বুনিয়াদ কৃষির ওপর। তছনছ হয়ে যায় এই বুনিয়াদ। লকডাউন প্রতিটি পরিবারকে আর্থিক দিক দিয়ে বিপর্যয়ের সামনে নিয়ে দাঁড় করিয়ে দেয়। ঠিক সেই সময়টাতেই আবার সেই প্রতারণার বিষবাষ্প ছড়িয়ে পড়ে।<br>
সংবাদে প্রকাশ, অনলাইন নেটওয়ার্ক বিজনেস এর প্রসার ঘটে। বিভিন্ন পোশাকি নাম রয়েছে। তবে বিজনেস মডিউল একটাই মুনাফার টোপ দিয়ে আমানত সংগ্রহ। সেইমতো প্রচুর সংখ্যায় ওইসব সংস্থা প্রচারের আলোয় আসে। একাংশ মানুষের ঝোঁক বাড়ে। একের পাশে দুই, দুইয়ের পাশে চার, চারের পাশে ষোল। এইভাবে গুণিতক ধাঁচে শুরু হয় ব্যবসা।
রাতারাতি লাখপতি হয়ে যাচ্ছেন অমুক তমুক। ভাগ মিলকা ভাগ এর মতো শুরু হয় টাকার পিছনে ভাগমভাগ। চায়ের স্টল থেকে শুরু করে সেলুন, সরকারি অফিস থেকে শুরু করে মাছবাজার সব জায়গাতেই কানাঘুষো আজ কত ঠুকল, ফ্লাস আউট হয়েছে এসব। করোনা পরিস্থিতিতে লকডাউন, কেয়ারেন্টাইন, আনলক, আইসোলেশন, কন্টেইনমেন্ট এর মতো যেমন কিছু লুপ্তপ্রায় শব্দের পুনঃপ্রচলন হয়েছে। তেমনি অনলাইন নেটওয়ার্ক বিজনেস এর প্রসারে কিছু নতুন শব্দের প্রচলন হয়েছে। যেমন- বাইনারি, কেপিং, পেয়ার মেচিং ইত্যাদি ইত্যাদি। এইসব শব্দগুলির সাথে তারাই সুপরিচিত যারা প্রতারণার ফাঁদে পা দিয়েছেন।
করোনা যখন মানুষের জীবনকে ব্যাতিব্যস্ত করে রখেছে তখন এই ভূঁইফোড় সংস্থার আবির্ভাব। এমনই একটি সংস্থা ইজি প্লে ১১। এই সংস্থার পিতামাতা আছে, নাকি বেওয়ারিশ, কোন তথ্য অনুসন্ধান না করেই এরাজ্যের বহু মানুষ মুনাফার ধান্দায় মাঠে নেমে পড়েন। সেই গুণিতক ধাঁচে চলতে থাকে নেটওয়ার্ক বিজনেস। তবে এই ব্যবসায় নেই কোন দ্বিতীয় ব্যক্তি যিনি টাকা পয়সা লেনদেন করবে। যারাই ব্যবসায় জড়াবেন তারা লেনদেন করবেন সংস্থাটির নিজস্ব ব্যাংক একাউন্ট। সেইভাবে চলছিল ব্যবসা। কিছুদিন ভালোই ভালোই চলে। দেনা পাওনা ঠিকঠাক ছিল। যখন কোটি কোটি টাকা আমানত মানুষের কাছ থেকে সংগ্রহ করে নিয়েছে তখনই শুরু হয়ে যায় জারিজুরি। সফটওয়্যার আপডেট, সার্ভার প্রবলেম এসব নানা টালবাহানা। অবশেষে ইন্তেকাল হল ইজি প্লে ১১ এর।
চারিদিকে শুর হৈচৈ। লাখপতি কোটিপতি অমক কৈ তমুক কৈ। তাকে ধর, ওকে ধর। সোশ্যাল মিডিয়ায় হাই হুতাশ। আপনি আপলাইন, আমি ডাউনলাইন। মাথায় বাজ পড়ল কিছু লোকের। তার বাড়িতে ধর্ণা, ওকে হুমকি, তাকে ধমকি। গণমাধ্যমে নিঃস্ব হওয়ার করুণ কাহিনী। রাস্তায় দাঁড়িয়ে এক ডজন দুই ডজন যুবকের হম্বিতম্বি সংবাদ চেনেলের ক্যামেরায়। আপলাইনের কিছু ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে তীব্র বিষোদগার। অমুক লিডার, তমুক লিডার। হুমকির সুরে লিডারকেই টাকা ফেরত দিতে হবে। এইসব চলছে রাজধানী আগরতলার ছত্রে ছত্রে। বাড়ছে আপরাধের প্রবণতা। ঘটে যেতে পারে অঘটন। বাড়ছে জীবনের ঝুঁকি। মামলার গেঁড়াকলে পড়তে পাড়ে বহু লোক। এমনই গুঞ্জন শরতের আকাশে বাতাসে।
কেন এমন হল? উত্তর খুঁজতে এই প্রতিবেদক বিভিন্ন পেশায় যুক্ত কয়েকজনের সাথে কথা বলেছেন। কে কি বলেছেন জেনে নিন:<br>
রাজকুমার রায় (তথ্য- প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ)।। রাজকুমারবাবুর বক্তব্য হল এইসব সংস্থাগুলি একই বিজনেস মডিউল ধরে কাজ করে। একটি কমন সফটওয়্যারে ডাটাবেইজ তৈরি করে রাখে। অটো জেনারেটেড। যেখান আইডি ক্রিয়েট করা থেকে শুরু করে পেমেন্ট গেটওয়ে সবই থাকে। এই পদ্ধতি চালু রাখা বা না রাখা নির্ভর করে যারা সংস্থা চালাবে তাদের মর্জির ওপর।
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে ওইসব নেটওয়ার্ক বিজনেস সংস্থাগুলির সিংহভাগই পেমেন্ট সেকশন অ্যাপের মাধ্যমে করে থাকে, আর ওই অ্যাপটির লিংক প্রখ্যাত সংস্থা গুগল প্লে স্টোরে রাখে না। সেটা তাদের নিজস্ব সাইট ইউআরএল লিংক দিয়ে এপিকে মডিউলে তৈরি করা হয়। এইভাবে সংস্থাগুলি তাদের দায়বদ্ধতা আড়াল করার চেষ্টা করে। কাজেই কোন দোকান খুলে ব্যবসা করার আগে যেমন দেখে নিতে হয় কোন জায়গায় দোকান খুললে ব্যবসা স্থায়ী হবে। তেমনি এইসব প্রযুক্তিগত বিষয়গুলি দেখেই লগ্নি করা উচিত।
রঞ্জিত মজুমদার (পুলিশ আধিকারিক)।। আমাদের কাছে প্রায়শই এই ধরনের অভিযোগ লিখিত আকারে কিংবা মৌখিকভাবে আসে। মৌখিক ভাবে যেই অভিযোগ জমা পড়ে সেগুলি নিযে কিছু বলার থাকে না। তবে লিখত অভিযোগ আসলে সুনির্দিষ্ট ধারায় মামলা রুজু করা হয়। তদন্ত হয়। তদন্তের স্বার্থে অনেককেই জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। প্রয়োজনে গ্রেফতার করে আদালতে সোপর্দ করা হয়। কিন্তু, এইসব ঘটনায় আমার অভিজ্ঞতা হল মামলা করা হলে ওই সংস্থার মূল কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে করা উচিত। স্থানীয় স্তরে যারা রয়েছেন তাদের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলে কোন সুফল মিলে না। কারণ, মনে করুন আপনি একজন ব্যবসায়ী। পণ্য বিক্রি করেন। আপনার প্রতিবেশী ব্যবসায়ী যেই কোম্পানির পণ্য বিক্রি করছেন সেই পণ্যটি বাজারে খুব প্রচলিত। তিনি ভাল মুনাফা পেয়েছেন। আপনিও সেই পণ্য বিক্রি শুরু করলেন। হঠাই পণ্যের গুণগত মান তলানিতে নেমে গেছে, আর আপনার স্টক অনেক বেশী। আপনার লোকসান হচ্ছে, তাহলে কি আপনি ওই প্রতিবেশী ব্যবসায়ীকে লোকসানের দায় নিতে বলবেন? মোটেও এটা যুক্তিসংগত নয়। তা নীতির বিরুদ্ধে এবং গর্হিত অপরাধ।
পুলক রায় (আইনজীবী)।। এই ধরনের ঘটনা ব্যতিক্রমি নয়। এরাজ্যে চিটফান্ড সংস্থাগুলি এজেন্ট মারফত কমিশন দিয়ে টাকা সংগ্রহ করেছে। যারা ঠকেছেন বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তারা একজন এজেন্টের মাধ্যমে টাকা আমানত হিসেবে চিটফান্ড সংস্থায় রেখেছেন। সেই ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে সংস্থার কর্ণধার কিংবা আইনত পদাধিকারীদের বিচারের আওতায় আনা হয়েছে। একবারও তো কোন এজেন্টের বিরুদ্ধে আঙুল তোলা হয়নি কিংবা মামলা করা হয়নি। আর এই ক্ষেত্রে তো ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি নিজেই তার গলা বাড়িয়ে দিয়েছেন হাড়িকাঠে। নিজেই একাউন্ট আই ডি বানিয়ে ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছেন। এখন ঠকে যাওয়ার পর কে লাভবান হয়েছেন তার বিরুদ্ধে সুর না চড়িয়ে যারা কোম্পানির মূল কান্ডারী তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা উচিত। কাঠগড়ায় তোলা উচিত। সেটাই বুদ্ধিমানের কাজ। না হল মেনে নিতে হবে আপনার ক্ষতি আপনার বিধিলিপি।